উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন মুসলিম
প্রার্থীরা। দেশটির আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে
অন্তত সাতজন মুসলিম আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন
প্রথমবারের মতো কংগ্রেসে প্রবেশ করছেন এবং চারজন পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের বিজয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনিই প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটে নির্বাচিত
হয়েছেন।
৩ নভেম্বর মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রিপাবলিকানদের
পরাজিত করে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এই রাজনৈতিক
পালাবদলের পাশাপাশি মুসলিম প্রতিনিধিদের সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ও
বহুধর্মীয় সমাজে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত
হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির ৪ নভেম্বরের
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে জয়ী মুসলিম প্রার্থীদের প্রচারে
স্বাস্থ্যসেবা, নাগরিক অধিকার, অভিবাসননীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁদের কয়েকজন গাজায়
ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার
প্রতিষ্ঠার পক্ষে সরব ছিলেন।
মিশিগানে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সাইয়েদ
মিশিগানের
আলোচিত সিনেট নির্বাচনে ৪২ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ
রিপাবলিকান দলের সাবেক কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন। অবসর
নেওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের ছেড়ে দেওয়া আসনে তাঁর এই বিজয়
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
পেশায়
চিকিৎসক এল-সাইয়েদ ডেট্রয়েটের সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা। নির্বাচনী
প্রচারে তিনি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসাব্যয় কমানো, করপোরেট অর্থের
রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাসের
প্রতিশ্রুতি দেন।
ইসরায়েলকে শর্তহীন মার্কিন সামরিক সহায়তার বিরোধিতা
এবং গাজায় ইসরায়েলি অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করার কারণে তিনি
বিতর্কের কেন্দ্রেও ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারে তাঁর মুসলিম ধর্মীয় পরিচয়কে
কেন্দ্র করে আক্রমণ ও সমালোচনা করা হয়। এমনকি ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাথমিক
নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেন্স শেষ মুহূর্তে রিপাবলিকান
প্রার্থী রজার্সকে সমর্থন জানান। তা সত্ত্বেও এল-সাইয়েদের বিজয়
মুসলিম-আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকল।
নিউ জার্সিতে প্রথম মুসলিম কংগ্রেসম্যান আদম হামাউয়ি
নিউ
জার্সির ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আদম
হামাউয়ি রিপাবলিকান গ্রেগ মেলেকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছেন। ৫৬ বছর বয়সী
হামাউয়ি নিউ জার্সি থেকে কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম প্রতিনিধি।
পেশায়
প্লাস্টিক সার্জন হামাউয়ি মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক সামরিক চিকিৎসক এবং
ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। ২০২৪ সালে তিনি গাজার ইউরোপীয় হাসপাতালে
স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নির্বাচনী প্রচারে তিনি
সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও শিক্ষাঋণের বোঝা কমানো, অভিবাসন ও
শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসিই বিলুপ্ত এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা
বন্ধের পক্ষে অবস্থান নেন।
নিউইয়র্কে দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের চমক
নিউইয়র্কে
প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী দারিয়ালিজা
আভিলা শেভালিয়ে। জুনে অনুষ্ঠিত দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে দীর্ঘদিনের
কংগ্রেসম্যান আদ্রিয়ানো এসপাইয়াতকে পরাজিত করেই তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে
আলোচনায় আসেন।
ইসলাম গ্রহণকারী শেভালিয়ে নাগরিক
অধিকারবিষয়ক
তদন্তকারী এবং ডক্টরাল পর্যায়ের শিক্ষার্থী। সাধারণ নির্বাচনে তিনি ৮৫
শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর
প্রচারের অন্যতম বিষয় ছিল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার,
তৃণমূলের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন। নিউইয়র্কের
মতো বহুজাতিক মহানগরে তাঁর বিজয় মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নতুন
মাত্রা যোগ করেছে।
পঞ্চমবারের মতো বিজয়ী রাশিদা তালিব
মিশিগানের
১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন
ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট রাশিদা তালিব। তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী
জেমস হুপারকে পরাজিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একমাত্র
ফিলিস্তিনি-আমেরিকান প্রতিনিধি হিসেবে তালিব দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের
আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং ইসরায়েলকে মার্কিন
অস্ত্র সরবরাহের নীতির কঠোর সমালোচনা করে আসছেন।
গাজায় ইসরায়েলি সামরিক
অভিযানের বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার অবস্থান তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয়
রাজনীতিতে আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
ইলহান ওমরের টানা পঞ্চম বিজয়
মিনেসোটার
পঞ্চম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন
সোমালি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট ইলহান ওমর। তিনি রিপাবলিকান জন নাগেল ও
স্বতন্ত্র প্রার্থী ডিভেল জ্যাকসনকে পরাজিত করেন।
শৈশবে শরণার্থী হিসেবে
যুক্তরাষ্ট্রে আসা ওমর ২০১৯ সালে কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ
করেন। তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সোমালি-আমেরিকান ফেডারেল আইনপ্রণেতা।
অভিবাসীদের
অধিকার, মানবিক সহায়তা এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার
পক্ষে তাঁর অবস্থান সুপরিচিত। বিশেষ করে ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ ও
ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাঁর বক্তব্য জাতীয় রাজনীতিতে বারবার বিতর্ক সৃষ্টি
করেছে।
ইন্ডিয়ানায় আসন ধরে রাখলেন আন্দ্রে কারসন
ইন্ডিয়ানার
সপ্তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট
আন্দ্রে কারসন। তিনি রিপাবলিকান প্যাট্রিক ম্যাকঅলি এবং লিবার্টারিয়ান
প্রার্থী জেমস সেনিয়াককে পরাজিত করেন।
২০০৮ সাল থেকে প্রতিনিধি
পরিষদের সদস্য কারসন বর্তমানে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী
মুসলিম কংগ্রেসম্যান। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং
মানবিক সহায়তার পক্ষে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ায় পুনর্নির্বাচিত লতিফা সিমন
ক্যালিফোর্নিয়ার
ইস্ট বে এলাকার ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন
ডেমোক্র্যাট লতিফা সিমন। তিনি একই দলের প্রতিদ্বন্দ্বী জেমি জয়েসকে পরাজিত
করেন।
সামাজিক ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সিমন ইসরায়েলকে আক্রমণাত্মক অস্ত্র সরবরাহের বিরোধিতা করেছেন।
এদিকে
ক্যালিফোর্নিয়ার আরেকটি কংগ্রেশনাল আসনে মুসলিম প্রার্থী আয়েশা ওয়াহাবও
প্রাথমিক ভোট গণনায় এগিয়ে ছিলেন। তাঁর আসনের ফলাফল চূড়ান্ত হলে কংগ্রেসে
মুসলিম প্রতিনিধির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের নতুন তাৎপর্য
যুক্তরাষ্ট্রের
প্রায় আড়াই শতাব্দীর রাজনৈতিক ইতিহাসে মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব
দীর্ঘদিন সীমিত ছিল। বিশেষ করে সিনেটে এতদিন কোনো মুসলিম সদস্য নির্বাচিত
হননি। আবদুল এল-সাইয়েদের বিজয় সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে।
এবারের
নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীদের সাফল্য শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতিনিধিত্বেই
সীমাবদ্ধ নয়। স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসন, নাগরিক অধিকার ও
পররাষ্ট্রনীতির মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে রেখেই তাঁরা ভোটারদের
সমর্থন পেয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি
যুক্তরাষ্ট্রের বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। বিশেষ
করে ফিলিস্তিন প্রশ্ন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ভূমিকা এবং ধর্মীয় ও
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে ভবিষ্যতে কংগ্রেসের আলোচনায় তাঁদের কণ্ঠ
আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত অবস্থান
আর যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় নীতিতে বাস্তব পরিবর্তন এক বিষয় নয়। কংগ্রেসে
তাঁদের প্রভাব কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আইন প্রণয়ন, দলীয় সমর্থন
এবং রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন
যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর জন্য এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক
অর্জন। প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচন এবং প্রতিনিধি পরিষদে নতুন ও পুরোনো
মুসলিম সদস্যদের বিজয় দেশটির রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে এক নতুন অধ্যায়ের
সূচনা করেছে।
সূত্র-ঠিকানা