উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ছালিয়াকান্দি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী
বাড়ি স্থানীয়ভাবে ‘ছালিয়াকান্দি জমিদার বাড়ি’ নামে পরিচিত। প্রায় শতবর্ষের
পুরোনো এই স্থাপনাটি বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলেও এর
স্থাপত্য, পারিবারিক ইতিহাস ও স্থানীয় জনশ্রুতি এখনো অতীতের সাক্ষ্য বহন
করছে। মুরাদনগরের জমিদার বাড়িগুলোর তালিকায় ছালিয়াকান্দি জমিদার বাড়ির
উল্লেখ বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনেও পাওয়া যায়।
স্থানীয় বর্ণনা
অনুযায়ী, এ জমিদার বংশের গোড়াপত্তনের সঙ্গে রাম কুমার রায়ের নাম জড়িত। আবার
কয়েকটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে ছালিয়াকান্দি জমিদার বাড়ির মালিক হিসেবে
গিরিশচন্দ্র রায়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বা
প্রথম জমিদার কে ছিলেন—এ বিষয়ে প্রাথমিক দলিল ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
দেওয়া সমীচীন নয়।
স্থানীয়দের দেওয়া পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, রাম কুমার
চৌধুরীর বংশধর বৃন্দাবন চৌধুরীর দুই ছেলে ছিলেন সত্যব্রত চৌধুরী ও স্বপন
চৌধুরী। স্বপন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী বাড়িটি স্থানীয় এক
চেয়ারম্যানের কাছে বিক্রি করেন বলে জানা যায়। বর্তমানে তাঁর এক ছেলে
নারায়ণগঞ্জে ব্যবসা করেন।
জমিদার বাড়িটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য এর প্রশস্ত
দক্ষিণমুখী বারান্দা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জমিদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ
করতে আসা প্রজারা সেখানে অপেক্ষা করতেন। ভবনটি একতলা হলেও উচ্চতায় প্রায়
দোতলা ভবনের মতো। উঁচু স্তম্ভ, খিলান, অলংকৃত জানালা, পিলাস্টার ও
কারুকার্যপূর্ণ বারান্দা স্থাপনাটিকে দৃষ্টিনন্দন করেছে। বাড়িটির স্থাপত্যে
ঔপনিবেশিক বাংলার নব্য-ধ্রুপদী প্রভাবের সঙ্গে স্থানীয় অলংকরণরীতির সমন্বয়
লক্ষ করা যায়।
পুরো ছালিয়াকান্দি গ্রামে প্রায় ২৮টি শানবাঁধানো
পুকুরঘাট রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। জমিদারদের তৈরি দিঘি ও পুকুরও এ
অঞ্চলের ঐতিহ্যের অংশ। তবে এসব স্থাপনার সঙ্গে জমিদার পরিবারের প্রত্যক্ষ
সম্পর্কের বিষয়টি পৃথকভাবে দলিল দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
কালের বিবর্তনে
বাড়িটির দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। বিভিন্ন স্থানে বটগাছ ও অন্যান্য
গাছের শিকড় ভবনের কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে সংরক্ষণ না হলে স্থাপনাটি
অদূর ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় কৃষক
শাহজাহানের বর্ণনায় জমিদারের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও লাঠিয়াল বাহিনী সম্পর্কে
নানা স্মৃতি পাওয়া যায়। তবে এসব বক্তব্যকে প্রত্যক্ষ ইতিহাস হিসেবে গ্রহণের
আগে আরও প্রামাণ্য অনুসন্ধান প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়,
ছালিয়াকান্দি জমিদার পরিবারের কেউ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত
হয়েছিলেন—এমন দাবি বর্তমানে ইউটিউব ও লোকমুখে প্রচলিত। একটি ইউটিউব
প্রতিবেদনে গিরিশচন্দ্র রায়ের নামও এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু
মুরাদনগরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানে এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য
লিখিত বা প্রাথমিক দলিল পাওয়া যায়নি। তাই প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবে নয়,
‘প্রচলিত কিন্তু অপ্রমাণিত তথ্য’ হিসেবেই বিষয়টি উল্লেখ করা অধিক
যুক্তিসঙ্গত।
ছালিয়াকান্দি জমিদার বাড়ি তাই শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়;
এটি স্থানীয় ইতিহাস, জমিদারি ব্যবস্থা ও লোকস্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ
নিদর্শন। যথাযথ ঐতিহাসিক অনুসন্ধান ও সংরক্ষণ উদ্যোগের মাধ্যমে এর প্রকৃত
ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন।