বুধবার, ২রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ৬.৬৬°সে
সর্বশেষ:

ভার্চুয়াল পাঠদান : ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব

মো. হাছিবুল বাসার মানিক শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  
একবিংশ শতাব্দী হচ্ছে এমন একটি বৈপস্নবিক সময় যেখানে যে দেশ যোগাযোগ প্রযুক্তি ও দক্ষতায় এগিয়ে থাকে সেই দেশ তত বেশি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধির পথে ধাবিত হয়। আর শিক্ষাব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এনে দিচ্ছে নতুন নতুন সাফল্য। সারা বিশ্বসহ বাংলাদেশ এই করোনা দুর্যোগে মহামারির একটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের জীবন-জীবিকা, শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা সবকিছুই যেন এক ধরনের হুমকির মুখোমুখিতে দাঁড়িয়েছে। সমস্যা কেবল শুধু বাংলাদেশেরই নয়, পুরো পৃথিবীজুড়েই সমস্যা তৈরি হয়েছে। সারা বিশ্ব এই সমস্যা মোকাবিলা ও সংকট উত্তরণের জন্য সমাধান খুঁজছে। দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে আছে এইচএসসি পরীক্ষা। ইতিমধ্যেই বাতিল হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা। এতে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাত্যহিক পড়াশোনা থেকে অনেকটাই ছিটকে পড়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে যে বড় ধরনের ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছে, তা চাইলেই পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে অনেকাংশেই লাঘব করা সম্ভবও বটে। করোনার মতো মহামারি সমস্যায় যখন স্কুল-কলেজে উপস্থিত হওয়া নিরাপদ নয়, তখন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ই-লার্নিং ধারাকে অব্যাহত রাখাই বড় সমাধান। এই দুঃসময়ে শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। উন্নত বিশ্বে দূরশিক্ষণ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদেরও এই পথ অনুসরণ করতে হবে। ইতিমধ্যেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে শিক্ষার্থীরা সরকার কর্তৃক নেওয়া ই-লার্নিং উদ্যোগের কতটুকু সফল বাস্তবায়ন করতে পারছে সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার প্রথমপর্যায়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য সংসদ টিভিতে ক্লাস সম্প্রচার করার ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু দেখা যায়, মাত্র অল্প শতাংশ শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্যোগটি সফল হয়েছে। বৃহত্তর অর্থে তেমন সাফল্যের মুখ দেখেনি ‘আমার ঘরে আমার স্কুল’ নামের অনুষ্ঠানগুলো। তা ছাড়া দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি স্কুল ও কলেজও বিভিন্ন অ্যাপসের (যেমন: জুম অ্যাপস, গুগল মিট, গুগল ক্লাসরুম, ফেসবুক লাইভ ইত্যাদি) মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কর্মসূচি শুরু করেন। নানা জটিলতায় ক্লাসগুলো এখনো সম্পূর্ণরূপে ফলপ্রসূ হয়নি। তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে তেমন আশানুরূপ সাফল্য মেলেনি। কতটুকু ফলপ্রসূ হচ্ছে অনলাইনভিত্তিক পাঠদানব্যবস্থা? দেশের সব শিক্ষার্থী কি সমান সুযোগ পাচ্ছে কিংবা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। আপনাদের সামনে তুলে ধরব অনলাইনভিত্তিক পাঠদানের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবগুলো।

সেশন জট কমানো : সরকারি চাকরিতে যোগদানের বয়সসীমা ৩০ হওয়ায় উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীরা এমনিতেই চিন্তায় থাকেন। করোনাকালে শিক্ষাব্যবস্থা স্থবির থাকায় সেশন জটের আশঙ্কা ও শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট হচ্ছে। তাই সেশন জট মোকাবিলার লক্ষ্যে ভার্চুয়াল পাঠদান একটি অন্যতম সমাধান। অনলাইনভিত্তিক পরীক্ষাও নেওয়া যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের খুব নীতিবান ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

মনোযোগ : দিনে সর্বোচ্চ দুই-তিনটি ক্লাস হওয়ায় মনোযোগের ঘাটতি হয় না এবং খুব ভালোভাবেই বিষয়বস্তু রপ্ত করা যায়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা স্কুল-কলেজ, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে বসে সামাজিক দূরত্ব মোকাবিলা করা বেশ কষ্টকর হতো। কিন্তু ভার্চুয়াল ক্লাসের কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভবপর হচ্ছে।

শিক্ষক ও বন্ধু-বান্ধবের কুশল বিনিময়: অনলাইনভিত্তিক পাঠদানের ফলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ফাটলে একটু হলেও ভাটা পড়ে। তবে শিক্ষার্থীরা চাইলে যে কোনো সময় শিক্ষকের পরামর্শ নিতে পারে। ভার্চুয়াল ক্লাসে একজন শিক্ষকের লেকচার শোনার চেয়ে ক্লাসরুমে শ্রবণ করলে সেটা বেশি কার্যকর হয়।

নেটওয়ার্ক সমস্যা : আমাদের দেশ এখনো পর্যন্ত প্রযুক্তিতে তেমন উন্নতি করতে পারেনি। যার ফলে শহরাঞ্চলে নেটওয়ার্ক সমস্যা তেমন না হলেও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নেটওয়ার্কের ত্রম্নটি একটি মারাত্মক রকমের সমস্যা। শহরে ফোরজি নেটওয়ার্ক অহরহ পাওয়া গেলেও গ্রামে কোথাও কোথাও টুজি নেটওয়ার্কও মেলে না।

ডিভাইস সমস্যা: ২০১৯-এর পরিসংখ্যান মতে আমাদের দেশের জনসংখ্যার ২০.৫% দরিদ্র ও ১০.৫% হতদরিদ্র সীমার নিচে বাস করে। সে হিসাব অনুযায়ী আমাদের অনেকেরই একটা স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্য থাকে না। সেখানে ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের কথা চিন্তা করাই মুশকিল। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন নেই। তাহলে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অবস্থা কি হবে ভেবে দেখেছেন?

ইন্টারনেট প্যাকেজ সমস্যা : আমাদের দেশের সিম কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে উচ্চমূল্যে ইন্টারনেট সেবা প্রদানের বিষয়টি। নেটওয়ার্ক সমস্যা তো আছেই আবার তেমন কোনো ইন্টারনেট প্যাকেজ সুবিধা দিচ্ছে না বলে শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েন। তাই উচ্চমূল্যে ইন্টারনেট কেনার সামর্থ্য অনেক শিক্ষার্থীরই নেই।

দক্ষতার অভাব : যেহেতু আমাদের দেশ প্রযুক্তিতে এখনো অনেক পিছিয়ে, তাই ক্লাস করানোর মতো দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। তা ছাড়া ক্লাস করার মতো দক্ষ শিক্ষার্থীরও অভাব বিদ্যমান। কারণ ভাচু্যয়াল ক্লাসের জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী দুই শ্রেণির জন্যই প্রশিক্ষণ আবশ্যক। বাস্তবতা বলছে, দুই শ্রেণি করোনার আগে অনলাইন পাঠে তেমন পরিচিত ও আগ্রহী ছিল না। তাই উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাব ভার্চুয়াল ক্লাসের জন্য অন্যতম একটি প্রতিবন্ধকতা।

শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি: দীর্ঘ সময় যদি অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হয় তবে শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। যেমন- চোখের ক্ষতি, মেজাজ খিটমিটে হওয়া, জীবনীশক্তি কমে যাওয়া ইত্যাদি। তাই স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিবেচনায় অনলাইন ক্লাস পরিহার করছে শিক্ষার্থীরা।

অনলাইনে পরীক্ষা : সেশন জট কমানোর লক্ষ্যে বড় উপায় অনলাইনভিত্তিক পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা। তবে এটি অসম্ভব। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও অনৈতিকতার প্রশ্নে অনলাইনে পরীক্ষার কথা কল্পনা করা যায় না। প্রত্যেকটি বিষয়ের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক রয়েছে। সব নেতিবাচক দিককে পিছনে ফেলে যে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে যায়, সেই সফল। বর্তমান পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তির ছোঁয়ায়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল-মিলিয়ে চলতে হলে আমাদেরও প্রযুক্তির শিক্ষায় দক্ষ হতে হবে। করোনা সংকটকালে ভার্চুয়াল ক্লাসকে ফলপ্রসূ করতে সরকারের পাশাপাশি নিজেদেরও সচেতন হতে হবে। তবেই অনলাইন পাঠদান শিক্ষার্থীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

নিরাময় কেন্দ্রে পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু, দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে
এইচএসসি পরীক্ষা: জটিল হলেও সমাধানযোগ্য
ধর্ষকদের সমাজে চোখ অন্ধ, বিবেকের কণ্ঠও স্তব্ধ
মানবপাচার রোধে কঠোর হতে হবে
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজন টেকসই পদক্ষেপ
নবীন উদ্যোক্তাদের মূল্যায়ন হোক

আরও খবর