সোমবার, ২৪শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ ০.৩°সে
সর্বশেষ:
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাড়ল পাউরুটির দাম ক্যামেরুনের রাজধানী ইয়াউন্ডের নাইটক্লাবে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ১৬ ৯০ বছরের বৃদ্ধা সাংবাদিক দেলোয়ার হাসানের মা আমরণ অনশনে শাবির আন্দোলনে একাত্মতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নার্গেস মোহাম্মদীকে৭০ বেত্রাঘাতের নির্দেশ বরিশালে জেলা দক্ষিণ ও মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে তোলপাড় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য নিবন্ধন জরুরি: সংসদে শিক্ষামন্ত্রী যমুনা টিভির সাংবাদিকের উপর হামলা, প্রধান আসামি গ্রেপ্তার চকরিয়ায় সালিসে অংশ নিতে এসে খুন করোনার কারণে বিয়েও বাতিল করলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইসি গঠন আইন বিল সংসদে উত্থাপন পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

মনিরুল হক রনি:
অ্যান্টিবায়োটিক এক ধরনের জৈব-রাসায়নিক ওষুধ, যা সাধারণত রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে বা এর বৃদ্ধি রোধ করে। রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে মাত্রা বিবেচনায় চিকিৎসকগণ প্রায়ই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন, যাতে দ্রম্নত তা জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক যদি জীবাণু প্রতিরোধে সক্ষম না হয়ে বরং উল্টো জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠে, তবে বিষয়টি যতটা না আশ্চর্যের তার চেয়ে বেশি উদ্বেগের। সম্প্রতি এমন তথ্যই উঠে এসেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রোবায়োলজি (এএসএম)-এর যৌথ এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ)-এর পৃথক দুটি গবেষণায়। দেশের শীর্ষস্থানীয় ১০টি হাসপাতালে দুই বছরব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও এর কার্যকারিতা নিয়ে করা আইইডিসিআর ও এএসএম-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১০টি অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যে সেফট্রিয়াক্সোন সরকারি হাসপাতালে ৭৬ শতাংশ ক্ষেত্রে জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অক্ষম এবং বেসরকারি হাসপাতালে তা ৪৩ শতাংশ। আর ১২টি অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে এনএসইউ-এর গবেষণায় দেখা গেছে, বহুল ব্যবহৃত এমোক্সিসিলিন ৯৮ ভাগ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারছে না এবং সেফুরক্সিম ও কোট্রাইমোক্সাজল-এর ক্ষেত্রে তা যথাক্রমে ৭৫ ও ৬২ ভাগ। এভাবে প্রায় প্রতিটি অ্যান্টিবায়োটিকের কম-বেশি অকার্যকর হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে গবেষণাগুলোতে।

ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর না হওয়ার বিষয়টি যথেষ্ট ভাবনার এবং উদ্বেগের। তবে এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং এটি এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। সারা বিশ্বেই জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হওয়ার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন জীবাণু ধ্বংস করতে নির্দিষ্ট মাত্রা এবং নির্দিষ্ট সময় ধরে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে অ্যান্টিবায়োটিক জীবাণু প্রতিরোধে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং জীবাণু ধীরে ধীরে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে টিকে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে। জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিকের এমন অকার্যকারিতা চিকিৎসা ব্যবস্থাকে যেমন হুমকির মুখে ফেলছে, তেমনি পুরো বিশ্বও প্রতিনিয়ত ধাবিত হচ্ছে এক অদৃশ্য মহামারির দিকে। ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতাকে একটি মহামারির পদধ্বনি (পাবলিক হেলথ ইমারজেন্সি অব ইন্টারন্যাশনাল কনসার্ন) বলে আখ্যায়িত করেছে। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রাতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার যে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে দিন দিন দুর্বল করে ফেলছে এবং এর অকার্যকারিতা বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতি ডেকে আনছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণে বছরে প্রাণ হারাবে প্রায় এক কোটি মানুষ, যাদের বেশিরভাগই হবে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের। এসবের মূলে রয়েছে মানুষ ও গবাদিপশুর জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক প্রয়োগ এবং সঠিক নিয়মে ওষুধ গ্রহণ না করা।

অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটি রোগ নিরাময়ের জন্য ছিল এক আশীর্বাদস্বরূপ। অথচ অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক ও যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে এটি আজ অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। প্রতিনিয়তই বাড়ছে এব অপরিমিত ও অযাচিত ব্যবহার। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হচ্ছে কোনো না কোনোভাবে। অথচ এটির যথোচিত ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে ‘অ্যাক্সেস’, ‘ওয়াচ’ ও ‘রিজার্ভ’- এই তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে পর্যায়ক্রমিক ব্যবহারের কথা বলেছে। প্রারম্ভিকতায় ‘অ্যাক্সেস’ ব্যবহার করার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় চিকিৎসকগণ ‘ওয়াচ’ দিয়ে শুরু করেন, যেটি সম্পূর্ণ অনুচিৎ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। গবেষণাগুলোর তথ্য বলছে, হাসপাতালগুলোতে ‘অ্যাক্সেস’-এর চেয়ে ‘ওয়াচ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। আশঙ্কাজনক তথ্য বটে!
অ্যান্টিবায়োটিক যে শুধু মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, তা নয়। মানুষ ছাড়াও গবাদিপশু পালন, হাস-মুরগি পালন এমনকি মৎস্য চাষেও এর ব্যবহার উলেস্নখযোগ্য। বিশ্বের যত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয় তার ৭০ ভাগই ব্যবহার হয় এসব ক্ষেত্রে। বিশেষ করে মৎস্য খাতে এর ব্যবহার হয় মাত্রাতিরিক্ত এবং সম্পূর্ণ ধারণার ভিত্তিতে। ক্রমবর্ধমান এ কৃষিখাতে পৃথক কোনো চিকিৎসক না থাকায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হয় বাছবিচারহীনভাবে, যা প্রকারান্তরে মাটি, পানি ও খাদ্যের সাথে মিশে আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

অ্যান্টিবায়োটিকের এমন আশঙ্কাজনক অপব্যবহার বৃদ্ধির পেছনে বহুবিধ কারণ বিদ্যমান বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এর অন্যতম কারণ অজ্ঞতা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ও সচেতনতার অভাব। অনেক সময় সর্দি, কাশি, জ্বরের মতো সাধারণ রোগের ক্ষেত্রেও অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ বা ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ইচ্ছেমত অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে থাকে, যেটি এর অপরিমিত ব্যবহারের আরেকটি প্রধানতম কারণ। এছাড়া অন্য কারণগুলোর মধ্যে পরিপূর্ণ মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া, দুর্বল সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, হাসপাতাল, ওষুধ শিল্প কারখানা ও পরীক্ষাগারে অপরিশোধিত বর্জ্য নিষ্কাশন, মানুষ, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগির মলমূত্রের সাথে অ্যান্টিবায়োটিক বা তার অংশ মাটিতে বা পানিতে মেশা উলেস্নখযোগ্য। বণিক মানসিকতাও অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের পেছনে আরেকটি উলেস্নখযোগ্য কারণ বলে মনে করেন অনেকে। কেননা এটি অপেক্ষাকৃত দামি ওষুধ। যত বিক্রি, তত লাভ। যে কারণে অধিক মুনাফা লাভের আশায় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিপণনকারী, অসাধু স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও ওষুধ বিক্রেতাদের একটি সিন্ডিকেট এটির অযৌক্তিক ব্যবহারে সর্বদা সচেষ্ট থাকেন। যেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তা রোধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে এখনই। এজন্য এটির যৌক্তিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এর অযৌক্তিক ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে কী ক্ষতি হতে পারে, সে ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, হ্যান্ডবিল, বিলবোর্ড, লিফলেট এবং সামাজিক, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করতে হবে। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, ক্রেতা-বিক্রেতা, স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ইত্যাদি সবার মধ্যে সচেতনতার এ বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। এ প্রচারাভিযানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ মসজিদের ইমাম, শিক্ষক এবং সমাজকর্মীদেরও যুক্ত করা যেতে পারে।

অদক্ষ ও অপেশাদার হাতুড়ে ডাক্তাররা কোনো ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই সামান্য অসুখেও অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় সেবনের পরামর্শ দেন রোগীকে। এ সমস্ত গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তারের অপতৎপরতা রোধ করতে হবে।

দেশে জাতীয় ওষুধ নীতিমালা থাকলেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা আজও করা হয়নি। এজন্য জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক নীতিমালা করে এর ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহারের উপর নিয়ন্ত্রণারোপ করতে হবে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মেসি ছাড়াও দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে হাজারও অনুমোদনহীন ওষুধের দোকান। এসব ওষুধের দোকানের অনভিজ্ঞ, অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত বিক্রয়কর্মীরা কোনো ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই চাহিবামাত্র অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয় করে থাকে। এ সমস্ত অনুমোদনহীন অবৈধ ওষুধের দোকানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অফিস ও কর্মকর্তাদের অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও অতিব্যবহার রোধে আরও তৎপর হতে হবে। কেননা যদি অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের কুফল সম্পর্কে মানুষকে সজাগ না করা যায়, তবে এর ফলে যে মহামারির সৃষ্টি হবে, তা ভেঙে ফেলতে পারে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে।

মনিরুল হক রনি : প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ সাভার সরকারি কলেজ, সাভার, ঢাকা

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

পুনঃভর্তি ফি আদায় বন্ধ হোক
উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে হবে
স্বাগত ২০২২: ক্ষত কাটিয়ে নবোদ্যমে চলার বছর হোক
সড়কে নৈরাজ্য: শৃঙ্খলা ফিরবে কবে?
মিয়ানমারের আইস বাংলাদেশে
নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করুন

আরও খবর


close