সোমবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৭.৩৭°সে

গণজোয়ারের সেই দিন

এম. নজরুল ইসলাম

সে একদিন এসেছিল বটে বাঙালী জাতির জীবনে। ৭ মার্চ ১৯৭১। জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা ভাষণ দেবেন। সকাল থেকেই প্রতীক্ষার প্রহর গুনেছে মানুষ। সব শ্রেণী-পেশার মানুষ ভিড় জমিয়েছিল রমনার রেসকোর্স ময়দান, আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। জনসমুদ্রে গণজোয়ার তোলা, ইতিহাস গড়া এক অপরাহ্নে তিনি এলেন। মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করলেন মানুষেরই মনের কথা। ‘ঘরে ঘরে দুর্গ’ গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নিয়ে ঘরে ফিরে গেল মানুষ। চরম সঙ্কটের দিনে জাতি নির্দেশনা পেয়েছিল ইতিহাসের সেই বরপুত্রের কাছ থেকে। তাঁর জাদুকরী সম্মোহনী শক্তিই বাঙালী জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল গুলির সামনে বুক পেতে দিতে। তিনি বরাভয় দিয়েছিলেন বলেই ভয় পায়নি জাতি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ইতিহাসের অনন্য ভাষণে গোটা বাঙালী জাতির প্রাণের সব আকুতি ঢেলে দিলেন। তা ছিল, অধিকারবঞ্চিত বাঙালীর শত হাজার বছরের আশা-আকাক্সক্ষা এবং স্বপ্নের উচ্চারণে সমৃদ্ধ। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ৭ মার্চ এক অত্যুজ্জ্বল মাইলফলক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদিন তাঁর সর্বশেষ কর্মসূচী ঘোষণা করবেন এটা ১ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করার পরই সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন। আর সে কারণেই ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসভার জন্য সমগ্র পাকিস্তানের সব মানুষ উৎকণ্ঠিত চিত্তে অপেক্ষা করছিলেন। যদিও ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগ আয়োজিত সভায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন। ওইদিনই তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, তাঁকে গ্রেফতার করা হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠের ভাষণটি বাঙালী জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল। এই ভাষণে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। দিলেন নির্দেশনা। কী পাচ্ছি আমরা এই ঐতিহাসিক ভাষণে? তাঁর এই ভাষণে আমরা পাচ্ছি সামরিক নির্দেশনা। তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দেবার না পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। …আমরা ভাতে মারব। আমরা পানিতে মারব।’ সেইসঙ্গে জনযুদ্ধের কুশলী আহ্বান জানালেন এভাবে, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব- এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ বঙ্গবন্ধু একজন রাজনৈতিক নেতা, সমরবিদ নন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যে এই সামরিক কৌশলের বিষয়টি অবলীলায় উঠে এলো কী করে? আজকের দিনের সমরবিদদের জন্য এটা গবেষণার বিষয় হতে পারে। ভাষণের শেষ দুটি বাক্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ঐতিহাসিক ভাষণের এই সর্বশেষ দুটি বাক্য পরবর্তী সময়ে বাঙালীর স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চূড়ান্ত সংগ্রামে অমূল্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল এক অনুপম অমর কবিতা। ছন্দোময় সে ভাষণ ছিল প্রাণস্পর্শী। উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ ছিল উদ্দীপনাময় অথচ কী আশ্চর্যজনকভাবে সংযত। লাখো মানুষের হৃদয়ে তা অনুরণিত হচ্ছিল- জয় বাংলা ধ্বনিতে আর করতালিতে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বেলিত জনতা তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর এই দৃপ্ত ভাষণ সে সময় সারা বাংলার মানুষ, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও ইপিআর, পুলিশ এবং বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের কাছে স্বাধীনতার সবুজ সঙ্কেত হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল।

কর্নেল জিয়াউর রহমান (১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন ‘মেজর’) ‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে লেখেন: ‘… তারপর এলো ১ মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহ্বানে সারা দেশে শুরু হলো ব্যাপক অসহযোগ আন্দোলন। …৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক ‘গ্রীন সিগন্যাল’ বলে মনে হলো।’ প্রবন্ধটি ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ দৈনিক বাংলা এবং ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। কৌশলগত দিক থেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের তাৎপর্য ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু সারা পাকিস্তানের মানুষকে এটা দেখাতে সমর্থ হয়েছিলেন যে, সমগ্র পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও সামরিক জান্তা তাঁকে ক্ষমতায় বসতে দেয়নি। বঙ্গবন্ধু বাঙালীদের প্রথম আক্রমণকারী প্রতিপন্ন করতে চাননি। বঙ্গবন্ধুর কৌশলের কারণে বিশ্ববাসীর সমর্থন ও সহানুভূতি পেয়েছিল বাঙালীরা। অন্যদিকে পাকিস্তানীরা সমগ্র বিশ্বে খুনী ও লুটেরা হিসেবে নিন্দা এবং ঘৃণা কুড়ায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এ ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ (এমওডব্লিউ) তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এমওডবিব্লউ-তে এটাই প্রথম কোন বাংলাদেশী দলিল, যা আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হবে। এছাড়া বিশ্বের ১২টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে ঐতিহাসিক এই ভাষণটি।

আজ সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। বলতে গেলে ১৯৭১ সালের এই দিনেই স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল বাঙালী জাতি। বিশ্বাস বুকে নিয়ে উর্বর পলিতে দৃপ্ত পা রেখে আকাশসমান স্বপ্ন নিয়ে যে পথ হাঁটছি আমরা, যাঁর প্রেরণায়, তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

লেখক : সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং

অস্ট্রিয়া প্রবাসী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

সুনামগঞ্জের আলোক বাতি ।। সাংবাদিকতার এক দিকপাল হাসান শাহরিয়া
সাংবাদিকতার সোনালী ভবিষ্যৎ, প্যাশন এবং প্রফেশনের যুগলবন্দী
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ রুখতে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে
যুগে যুগে যুদ্ধ সাংবাদিকতা
তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বাংলাদেশ সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মার্চ থেকে চলছে মুক্তিযুদ্ধ

আরও খবর