শুক্রবার, ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ২১.৫৬°সে
সর্বশেষ:
করোনার তৃতীয় ঢেউয়ে নাকাল যুক্তরাষ্ট্রে ফেসবুকের মাধ্যমে ১৪ বছর পর মিলল মা-মেয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানদের ইউএনওর মতো নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ:হাইকোর্ট সিলেটে-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিবের জাতীয় সংসদে প্রথম ভাষণ নীতিমালা চূড়ান্ত হলেই বাংলাদেশে আসছে বিদ্যুৎচালিত গাড়ি ভারত বাংলা‌দে‌শের ম‌ধ্যে অসাধারণ বন্ধু‌ত্বের সম্পর্ক মৃত্যুর ৫ বছর ‘ছাড়পত্র’ পেল দিতির সিনেমা চলমান করোনা মহামারিতে বিশ্বে এক দিনে মৃত্যু ১০ হাজার, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন ১নং ওয়ার্ড রোটা: আবুল হোসেন ছোটনের উদ্যোগে ভ্যাকসিন সনদ বিতরণ বাংলাদেশ হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ সংস্থা নিউজার্সির নতুন কমিটি গঠন গণমাধ্যমে শৃঙ্খলা আনার দাবি সাংবাদিকদেরই -ডিইউজে’র বার্ষিক সভায় তথ্যমন্ত্রী ইভ্যালির সিইও রাসেল, চেয়ারম্যান শামীমা গ্রেপ্তার

পরিবেশ রক্ষায় জৈবপ্রযুক্তির প্রসার জরুরি

মানব জাতি যতই সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ততই মনুষ্য সভ্যতা এক ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। সে সংকট হচ্ছে পরিবেশ সংকট বা দূষণ সমস্যা। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে পরিবেশের এ সংকট যে ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে এটা আজ আর বিতর্কের বিষয় নয়। পূর্বে বলা হতো, আঠারো-উনিশ শতকে ইউরোপের শিল্প-বিপস্নব ও তার পরবর্তীকালে পৃথিবী জুড়ে নানা ধরনের প্রযুক্তিগত উন্নয়নই মূলত এসব সমস্যার জন্য দায়ী। কিন্তু ক্রমেই এটা স্পষ্টতর হচ্ছে, এসব পরিবেশগত সংকটের জন্য শুধু শিল্পপ্রযুক্তিই দায়ী নয়, এর সঙ্গে অন্যান্য বিষয় ও জড়িত। চারদিকে পরিবেশের অবনতির লক্ষণ আজ অতি স্পষ্ট। খনিজ জ্বালানিতে যেসব শিল্প-কারখানা চলে সেগুলো দিন-রাত বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে বায়ুমন্ডলকে দূষিত করছে। এছাড়া কলকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য পদার্থ, মানুষের পরিত্যক্ত জৈব-অজৈব পদার্থসামগ্রীর সুব্যবস্থাপনার অভাব, ফসলে ব্যবহৃত রাসায়নিক কীটনাশকগুলো পরিবেশকে করে তুলছে বিষাক্ত। এর ফলে পরিবেশের বায়ু, পানি, ভূমি সবই হয়ে পড়ছে দূষিত। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও দূষণপ্রক্রিয়া দ্রম্নতগতিতে ঘটছে। এজন্য দূষণ আজ একটি বিশ্বসমস্যা। সুন্দর পরিবেশ ঠিক রাখা ও তৈরি করার জন্য দরকার সুন্দর ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা। তাই পৃথিবীর মানুষ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মিলিত হচ্ছে একই ছায়ায়, চেষ্টা করছে এর সঠিক প্রতিকারের পথ উদ্ভাবন করতে। ফলে আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। জৈবপ্রযুক্তি এদের মধ্যে অন্যতম। যে প্রযুক্তির সাহায্যে কোনো জীবকোষ, অণুজীব বা তার অংশবিশেষ ব্যবহার করে নতুন কোনো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীবের উদ্ভাবন বা উক্ত জীব থেকে প্রক্রিয়াজাত বা উপজাত দ্রব্য প্রস্তুত করা যায়, সে প্রযুক্তিকে জৈব প্রযুক্তি বলে। জৈবপ্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয় জীবের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন সাধনের জন্য। এটি উঘঅ :ৎধহংঢ়ষধহঃ মেথডে করা হয়। অন্যদিকে পরিবেশগত জৈবপ্রযুক্তি (এনভায়রনমেন্টাল বায়োটেকনোলজি) হলো জৈবপ্রযুক্তি, যা প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর প্রয়োগ করতে ব্যবহৃত হয়। দূষিত পরিবেশের (ভূমি, বায়ু, পানি) প্রতিকারের জন্য জৈবিক প্রক্রিয়ার বিকাশ, ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণকরণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াগুলোর জন্য (সবুজ উৎপাদন প্রযুক্তি এবং টেকসই উন্নয়ন)। পরিবেশগত জৈবপ্রযুক্তি উদ্ভিদ, প্রাণী, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং শেওলার মাধ্যমে প্রকৃতির সর্বাধিক ব্যবহার হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। তাছাড়া জৈবপ্রযুক্তি দূষিত পানি, বায়ু এবং কঠিন বর্জ্য প্রবাহের পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন, মডেলিং, এবং চিকিৎসা সম্পর্কিত সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য কাজে লাগানো যায়। চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে জৈবপ্রযুক্তির প্রয়োগ দেখা যায়। এগুলো হচ্ছে, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্পে শস্য ও অন্যান্য পণ্যের (যেমন: জৈবিক উপায়ে পচনশীল পস্নাস্টিক, উদ্ভিজ্জ তেল, জৈব জ্বালানি) ব্যবহার এবং পরিবেশ। অণুজীব দ্বারা জৈব পদার্থ প্রক্রিয়াজাতে জৈবপ্রযুক্তির প্রয়োগ হয়। আকরিক থেকে ধাতু নিষ্কাশনে ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহারও জৈবপ্রযুক্তির উদাহরণ। এছাড়া কোনো জিনিসকে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা, বর্জ্য শোধন, কলকারখানা দ্বারা দূষিত এলাকা পরিষ্কার এবং জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। আধুনিক যুগের কৃষকরা শ্রেষ্ঠ বীজ নির্বাচন ও ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ফলন ঘটিয়ে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করছে। যখন শস্য ও জমির পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পেয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল, তখন এমন কিছু জীব এবং তাদের থেকে উৎপন্ন পদার্থের সন্ধান পাওয়া যায়, যারা মাটির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি করে, নাইট্রোজেন সংবদ্ধকরণ করে এবং ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ বা পেস্ট দমন করে। কৃষির ইতিহাসে দেখা যায়, কৃষক ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন উদ্ভিদের সঙ্গে কোনো উদ্ভিদের প্রজনন ঘটিয়ে উদ্ভিদের জিনে কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে জৈবপ্রযুক্তির প্রাথমিক রূপ উন্মোচন করেছে। আধুনিক প্রজননবিদ্যার জ্ঞান, জৈবসারের মতো নতুন ধরনের সারের প্রয়োগ ও জৈব-কীটনাশকের মতো নতুন কীটনাশক দ্বারা কৃষি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির চিরাচরিত পদ্ধতি, উদ্ভিদের টিসু্য-কালচার ও মাইক্রোপ্রপাগেশন প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি উৎপাদনক্ষম বা বিশেষ জৈব রাসায়নিক শক্তিধর অণুজীব পৃথকীকরণ ইত্যাদি প্রচলিত জীবপ্রযুক্তির অন্তর্গত, যেখানে ডিএনএ-এর কৌশলী প্রয়োগ জড়িত নয়। আলুর ভালো ফলনের জন্য ভালো বীজ অত্যাবশ্যক। হিসাব করে দেখা গেছে, টিসু্য-কালচার থেকে পাওয়া রোগমুক্ত সবল বীজের মাধ্যমে আলুর ফলন দ্বিগুণ করা সম্ভব। সাধারণত টিসু্য-কালচার থেকে উৎপন্ন উদ্ভিদের সুবিধা হলো, এ পদ্ধতিতে উৎপন্ন চারাগুলো সবল ও ভাইরাসরোগ থেকে মুক্ত বলে ভালো ফলন দেয়। আর এতে উৎপাদন ও অধিক এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকিও কম। কলকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য পদার্থে বিভিন্ন ধরনের অণুজীব চাষ করে, তাদের এককোষী প্রোটিন (ংরহমষব পবষষ ঢ়ৎড়ঃবরহ) হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ধরনের জৈব প্রযুক্তিতে একদিকে যেমন বর্জ্য পদার্থেও পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা করে, অন্যদিকে মানুষসহ অন্যান্য পশুর প্রোটিনের চাহিদা পুরণ হয়। কাগজ ও কাগজের মন্ড (ঢ়ঁষঢ় ধহফ ঢ়ধঢ়বৎ রহফঁংঃৎু) থেকে নির্গত বর্জ্য পদার্থে বিভিন্ন ইস্ট (যেমন- ঞড়ৎঁষধ, ঝধপপযধৎড়সুপবং ইত্যাদি) জন্মায়, যেগুলো অধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ। বাংলাদেশে এ ধরনের জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক নয়, তবে চিনি কল থেকে উৎপন্ন পরিত্যক্ত বর্জ্য ঝোলাগুড় (সড়ষধংংবং)-কে আমরা মিডিয়াম হিসেবে ব্যবহার করে ঝধপপযধৎড়সুপবং পবৎবারংরধব-কে ব্যাপকভাবে চাষ করতে পারি। ঝধপপযধৎড়সুপবং পবৎবারংরধব রুটি তৈরির কারখানায় ব্যবহৃত হয়। সমুদ্রে চালিত তেলবাহী জাহাজ দুর্ঘটনায় পতিত হলে, জাহাজের তেল সাগরে পড়ে পানির উপর পুরু আস্তরণ সৃষ্টি করে। সমুদ্রে তেলজনিত দূষণরোধে অণুজীবের ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর, কেননা এসব অণুজীব হাইড্রোকার্বন অক্সিডাইজিং ক্ষমতা সম্পন্ন, অর্থাৎ এরা হাইড্রোকার্বনকে ভেঙে ফেলতে পারে। চংবঁফড়সড়হধং ঢ়ঁঃরফধ নামক ব্যাকটেরিয়া কেম্পর, অকটেন, জাইলন ও ন্যাপথালিন, এ চারটি প্রধান হাইড্রোকার্বনকে ভেঙে ফেলতে পারে। বর্তমানে চংবঁফড়সড়হধং, গুপড়নধপঃবৎরঁস, ঘড়পধৎফরধ প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়াকে সমুদ্রে তেল নিষ্কাশন ও পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাথরুমের সাবান পানি, রান্নাঘরের খাদ্যের অবশিষ্টাংশ, ময়লা পানি ও পয়ঃপ্রণালি হতে নির্গত মলমূত্র ইত্যাদি হচ্ছে সিউয়েজ পদার্থ। সিউয়েজ পদার্থে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, ক্ষতিকর পরজীবী ও প্রোটোজোয়া ইত্যাদি ক্ষতিকর জীবাণু বাস করে। ফলে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর বিভিন্ন ধরনের রোগের সৃষ্টি হয়, তাছাড়া পরিবেশ দূষিত হয়ে বসবাসের অনুপোযোগী হয়ে পড়ে। সিউয়েজ পদার্থের মধ্যে শতকরা ৯৯ ভাগের বেশি থাকে পানি এবং অবশিষ্ট অংশ প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, নাইট্রেট, ফসফেট ও ডিটারজেন্টে সমৃদ্ধ থাকে। জৈব প্রযুক্তি দ্বারা প্রথমে সিউয়েজ পদার্থগুলোর রূপান্তর করা হয়, পরে রূপান্তরিত পদার্থগুলো পস্নান্টের মাধ্যমে অত্যধিক তাপমাত্রার জলীয় বাষ্প দ্বারা জীবাণুমুক্ত করে তারপর বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে মূল্যবান সার ও বিশুদ্ধ পানিতে পরিণত করা হয়। জৈব প্রযুক্তি দ্বারা জৈব যৌগের পচনে ঘরঃৎড়ংড়সড়হধং, ঘরঃৎড়নধপঃবৎ, ঈষড়ংঃৎরফরঁস, চৎড়ঃড়লড়ধ প্রভৃতি অণুজীব ব্যবহার করা হয়। ইধপরষষঁং ফবহরঃৎরভরপধহং, চংবঁফড়সড়হধং, গরপৎড়পড়পপঁং প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া সিউয়েজ পদার্থের নাইট্রেট যৌগকে ভেঙে মুক্ত বায়বীয় নাইট্রোজেনে পরিণত করে। সবাত শ্বসন ব্যাকটেরিয়া (যেমন- অুড়ঃড়নধপঃবৎ), অবাত শ্বসন ব্যাকটেরিয়া (যেমন ঈষড়ংঃৎরফরঁস) ও সালোকসংশ্লেষণকারী ব্যাকটেরিয়া (যেমন- ঈষড়ৎড়নরঁস, জযড়ফড়ংঢ়রৎরষষঁস, জযড়ফড়ঢ়ংবঁফড়সড়হধং) ইত্যাদি অণুজীব সিউয়েজ পদার্থের উপাদানগুলোকে বিশ্লিষ্ট করে তরল পদার্থে পরিণত করে।

জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ দূরীকরণ অনেকাংশে সম্ভব। এছাড়া জৈবপ্রযুক্তি টিকা ও অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদনেও ব্যবহৃত হয়। গ্রে জৈবপ্রযুক্তি পরিবেশ রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও পরিবেশ দূষণ দূর করাই এর প্রধান লক্ষ্য। তার পদ্ধতি নিকাশী, মাটি উপসম পরিশোধনের জন্য ব্যবহার করা হয়, বায়ু নির্গমন স্ক্রাবিং, পুনর্ব্যবহারের জন্য। টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পরিবেশ তথা গোটা বিশ্বকে সংকটের হাত থেকে বাঁচাতে জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহারই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

তৌহিদা আক্তার

শিক্ষার্থী

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

ভোক্তার আচরণ ও পণ্যমূল্য
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে
টিকা না নেওয়া কি শাস্তিযোগ্য অপরাধ?
স্বাধীনতার নেপথ্য কারিগর
টিকা নিয়ে কিছু প্রশ্ন
শিক্ষাঙ্গনে নৈতিকতা ও শিক্ষার মানে অধঃপতন কেন

আরও খবর


close