শুক্রবার, ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ২১.৫৬°সে
সর্বশেষ:
করোনার তৃতীয় ঢেউয়ে নাকাল যুক্তরাষ্ট্রে ফেসবুকের মাধ্যমে ১৪ বছর পর মিলল মা-মেয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানদের ইউএনওর মতো নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ:হাইকোর্ট সিলেটে-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিবের জাতীয় সংসদে প্রথম ভাষণ নীতিমালা চূড়ান্ত হলেই বাংলাদেশে আসছে বিদ্যুৎচালিত গাড়ি ভারত বাংলা‌দে‌শের ম‌ধ্যে অসাধারণ বন্ধু‌ত্বের সম্পর্ক মৃত্যুর ৫ বছর ‘ছাড়পত্র’ পেল দিতির সিনেমা চলমান করোনা মহামারিতে বিশ্বে এক দিনে মৃত্যু ১০ হাজার, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন ১নং ওয়ার্ড রোটা: আবুল হোসেন ছোটনের উদ্যোগে ভ্যাকসিন সনদ বিতরণ বাংলাদেশ হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ সংস্থা নিউজার্সির নতুন কমিটি গঠন গণমাধ্যমে শৃঙ্খলা আনার দাবি সাংবাদিকদেরই -ডিইউজে’র বার্ষিক সভায় তথ্যমন্ত্রী ইভ্যালির সিইও রাসেল, চেয়ারম্যান শামীমা গ্রেপ্তার

টিকা না নেওয়া কি শাস্তিযোগ্য অপরাধ?

ডা. জাহেদ উর রহমান
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাকে বলে এবং সেটি কীভাবে গঠন করতে হয়, তা নিয়ে সম্যক ধারণা রাখে এ দেশের কতজন শিক্ষিত নাগরিক? বাদ দেই সম্যক ধারণা রাখার কথা, মোটামুটি প্রাথমিক ধারণা রাখে কতজন?
‘শিক্ষিত মানুষ’ বলে আমরা যাদের বোঝাই, তাদের সবারই কিছু সার্টিফিকেট আছে, এর বেশি কিছু জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রেই তাদের মধ্যে থাকে না। তাই নাগরিকরা অনেক সময় বুঝতে ভুল করেন ভাবাবেগ দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করা যায় না। তাই নানা ঘটনায় নাগরিকদের ভাবাবেগপূর্ণ আচরণ আমাদের দেশে স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু একটা রাষ্ট্রের বেসিক যদি না বুঝে থাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, তাহলে সেটা সেই জাতির জন্য এক কথায় মর্মান্তিক।

দুটো ঘটনার ওপরে ভিত্তি করে এ আলোচনা। কারও কারও কাছে ঘটনা দুটোকে হালকা মনে হতে পারে; কিন্তু আমি মোটেও তা বিশ্বাস করি না, বরং মনে করি এগুলো সিরিয়াস আলোচনার দাবি রাখে। কারণ এ দুটো ঘটনা আমাদের রাষ্ট্র গঠনের গোড়ার কিছু ধারণার পরিপন্থী। বিষয়টি তলিয়ে দেখার আগে ঘটনা দুটি জেনে নেওয়া যাক। প্রথম ঘটনাটি দিনাজপুরের হাকিমপুর পৌরসভার। সেখানে কী ঘটেছে জেনে নেওয়া যাক পৌর মেয়র জামিল হোসেন চলন্তের জবানিতে। কয়েক দিন আগে একটি নিউজ পোর্টালকে তিনি বলেন-‘‘করোনার টিকা গ্রহণ না করার কারণে আজ মঙ্গলবার থেকে কর্তব্যরত পৌর কর্মচারীদের বেতন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যারা টিকা নিচ্ছেন শুধু তাদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। এ কার্যক্রম আমাদের চলমান থাকবে। তবে গণটিকা দেওয়ার পরও যদি পৌর সেবাপ্রার্থীরা টিকা কার্ড প্রদর্শন না করে সেবা নিতে আসেন, তাহলে তাদের সব ধরনের সেবা দেওয়াও বন্ধ রাখা হবে। টিকার কার্ড প্রদর্শন করলে তাদের সেবা দেওয়া হবে। এজন্য আমরা এখন থেকে করোনার ‘নো সার্টিফিকেট নো সার্ভিস’ নামের সেবাটি চালু করেছি।’’

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে। এ অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে কয়েক দিন আগে। তাতে বলা হয়েছে, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের যেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী এখনো করোনার টিকা গ্রহণ করেননি তাদেরকে নিবন্ধন সম্পন্ন করে আগামী ১৬ আগস্টের মধ্যে টিকা গ্রহণ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।’ ‘অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ভ্যাকসিন গ্রহণ সম্পর্কিত টিকা কার্ড বা টিকা গ্রহণের সনদ আগামী ২২ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে প্রশাসনিক শাখায় জমা প্রদান করবেন’ বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া ভ্যাকসিন গ্রহণ না করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বেতন বন্ধসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

একটা পৌরসভার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি টিকা না দেওয়ার ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটা কি তিনি কোনোভাবে নিতে পারেন? এর চেয়েও বড় কথা, একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাষ্ট্রের (সরকারের নয়) সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার অফিস! সংক্রামক রোগ এবং মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশে একটি আইন আছে-সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮। আইনটি করা পর্যন্ত প্রাদুর্ভাব হওয়া ২৩টি সংক্রামক রোগের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আরও যে কোনো রোগকে এর অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। সেই অন্তর্ভুক্তকরণের মাধ্যমে সরকার নতুন রোগের ক্ষেত্রে মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য এ আইনের বিধানাবলি প্রয়োগ করতে পারবে।

প্রায় সব আইনের মতো এ আইনের অধীনে কতগুলো অপরাধ আছে, যেগুলোর জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। এ আইনে তিনটি ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধের কথা বলা হয়েছে এবং এগুলোর ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি প্রয়োগ করা হবে। দেখা যাক আইনটির অধীনে কোন কোন অপরাধের কথা বলা হয়েছে। ২৪ ধারায় আছে, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো সংক্রামক ব্যাধি বিস্তার করেন বা বিস্তারে সাহায্য করেন কিংবা সেটা গোপন করার মাধ্যমে অন্যের সংক্রমিত হওয়ার কারণ হন, তাহলে সেটা অপরাধ। ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংক্রামক ব্যাধি কিংবা মহামারি নিয়ন্ত্রণের কাজে নিয়োজিত যে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তার দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়াটা অপরাধ। ২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেউ কোনো সংক্রামক ব্যাধির সঠিক তথ্য জানার পরও বিকৃত বা মিথ্যা তথ্য দেওয়াটা অপরাধ। এসব ক্ষেত্রে কী শাস্তি হবে, অন্যসব আইনের মতো সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোতে সেটা বলেও দেওয়া আছে। এ আইনে অপরাধের ধরন অনুযায়ী ২ মাস থেকে ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড কিংবা ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা আছে। অর্থাৎ এ আইনের অধীনে শুধু এ তিনটি ক্ষেত্রেই কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা যাবে এবং তার বিচার করা যাবে। আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছি, এ আইনের কোথাও টিকা না দেওয়াটা অপরাধ নয়। এমনকি সরকার এখনো পর্যন্ত সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে টিকা নিতে হবে, তেমন কোনো ঘোষণাও দেয়নি। সত্যি বলতে, সরকার এমন ঘোষণা এখন অন্তত দিতে পারে না। সরকার যদি মনে করে টিকা দেওয়াটা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং টিকা না নিলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেক্ষেত্রে সরকারকে নতুন একটি আইন করতে হবে অথবা আলোচ্য আইনটির সঙ্গে এই বিধান অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নতুন ধারা যুক্ত করতে হবে।

প্রশ্ন আসতেই পারে, এখন তো সংসদ চলছে না, তাহলে জরুরি পরিস্থিতিতে সরকার কী করবে? এ জরুরি পরিস্থিতির জন্যই রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের বিধান রাখা আছে। মুহূর্তেই এমন একটি অধ্যাদেশ জারি করা যায় যেটা পরে সংসদ অধিবেশনে আইনের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেই হবে। একটা রাষ্ট্র চলে আইনের ভিত্তিতে এবং সব আইনের উপরে সর্বোচ্চ নীতিমালা হিসাবে থাকে সংবিধান। সংবিধানের কোনো বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না, এমন যে কোনো আইন রাষ্ট্র প্রণয়ন করতে পারবে। একটা রাষ্ট্রের চলার পথে নতুন নতুন পরিস্থিতি তৈরি হবে, নতুন নতুন সমস্যা আসবে; তাই রাষ্ট্রকেও নতুন নতুন আইন তৈরি করতে হবে। যেমন সাম্প্রতিককালে পৃথিবীতে নতুন মুদ্রা ধারণা ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে। আমাদের দেশও এর বাইরে নয়। বাংলাদেশ ক্রিপ্টোকারেন্সিকে যদি বৈধতা দিতে চায় তাহলে এর জন্য নতুন করে একটি আইন করতে হবে এবং তাতে অপরাধসহ সবকিছুর উল্লেখ থাকবে। নাগরিক হিসাবে এটা আমাদের বোঝা জরুরি যে, আইন তৈরি করা ছাড়া রাষ্ট্র কোনোভাবেই তার নাগরিকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। এই যে রাষ্ট্র পরিচালনার খুবই মৌলিক একটা নিয়ম, এটা মানতে সরকার ও রাষ্ট্রের আর সব সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাধ্য।

দিনাজপুরের হাকিমপুর পৌরসভা ঘটনাটির খবরে দেখা যায় পৌরসভার এমন পদক্ষেপের প্রশংসা করছে সেই পৌরসভার বাসিন্দাদের প্রায় সবাই। আমাদের মনে থাকার কথা, দেশে যখন প্রথম নানা নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু হয় তখন সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে ভুক্তভোগী মানুষরা সেই হত্যাকাণ্ডগুলোতে খুশি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি এখন আর সেরকম না থাকলেও এখনকার বাংলাদেশেও বহু ‘শিক্ষিত’ মানুষ মনে করেন, এভাবে যদি ভালো হয় তাহলে সেটা বেআইনি কিংবা অসাংবিধানিক হোক, তাতে কিছু আসে যায় না। এটা নিশ্চিতভাবেই ভয়ংকর এক ব্যাধি।

রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসাবে আমার কাছে সবচেয়ে আশঙ্কার ব্যাপার, যখন দেখি খুব সাধারণ নাগরিক বা জনপ্রতিনিধি নন, খোদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস এ ধরনের সিদ্ধান্তের কথা বলে। কখনো রাষ্ট্রীয় কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি আপাতদৃষ্টিতে ভালো কোনো কাজ আইনবহির্ভূতভাবে করে ফেলে সেটা কোনোভাবেই প্রশংসিত হওয়া তো উচিতই নয়, বরং এর শক্ত প্রতিবাদ হওয়া উচিত। আমরা মনে রাখব, বেআইনি পথে হওয়া ভালো কাজটিও আদতে রাষ্ট্রের মূলভিত্তি, রাষ্ট্রের বিকশিত হওয়ার পথটিকে নষ্ট করে। হোক তা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা কিংবা টিকা না নিলে শাস্তির ঘোষণার মতো আপাতদৃষ্টিতে ছোট বিষয়।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

 

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

ভোক্তার আচরণ ও পণ্যমূল্য
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে
পরিবেশ রক্ষায় জৈবপ্রযুক্তির প্রসার জরুরি
স্বাধীনতার নেপথ্য কারিগর
টিকা নিয়ে কিছু প্রশ্ন
শিক্ষাঙ্গনে নৈতিকতা ও শিক্ষার মানে অধঃপতন কেন

আরও খবর


close