শুক্রবার, ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ২১.৬৪°সে
সর্বশেষ:
করোনার তৃতীয় ঢেউয়ে নাকাল যুক্তরাষ্ট্রে ফেসবুকের মাধ্যমে ১৪ বছর পর মিলল মা-মেয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানদের ইউএনওর মতো নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ:হাইকোর্ট সিলেটে-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিবের জাতীয় সংসদে প্রথম ভাষণ নীতিমালা চূড়ান্ত হলেই বাংলাদেশে আসছে বিদ্যুৎচালিত গাড়ি ভারত বাংলা‌দে‌শের ম‌ধ্যে অসাধারণ বন্ধু‌ত্বের সম্পর্ক মৃত্যুর ৫ বছর ‘ছাড়পত্র’ পেল দিতির সিনেমা চলমান করোনা মহামারিতে বিশ্বে এক দিনে মৃত্যু ১০ হাজার, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন ১নং ওয়ার্ড রোটা: আবুল হোসেন ছোটনের উদ্যোগে ভ্যাকসিন সনদ বিতরণ বাংলাদেশ হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ সংস্থা নিউজার্সির নতুন কমিটি গঠন গণমাধ্যমে শৃঙ্খলা আনার দাবি সাংবাদিকদেরই -ডিইউজে’র বার্ষিক সভায় তথ্যমন্ত্রী ইভ্যালির সিইও রাসেল, চেয়ারম্যান শামীমা গ্রেপ্তার

টিকা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

ডা. জাহেদ উর রহমান/যুগান্তর/ভিওএনজে ডেস্ক:
বেশ কয়েক বছর ধরে দেখছি, আফগানিস্তান নামক যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং বর্তমানে প্রায় পুরো মাত্রার গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি আফগানিস্তান বাংলাদেশের ‘সম্মান’ রক্ষা করছে। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার মানদণ্ডে আমরা যখন একেবারে তলানিতে থাকি, তখন এ দেশটি আমাদেরও নিচে অবস্থান করে সর্বশেষ হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেয়। এ তো কয়েকদিন আগেই ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ মোবাইল ইন্টারনেট স্পিডে পৃথিবীতে একেবারে সর্বশেষ দেশটি হওয়া থেকে বেঁচে গেছে যে দুটি দেশের কারণে তার একটি আফগানিস্তান।

অতি সম্প্রতি আফগানিস্তান আমাদের আবারও সর্বশেষ হওয়া থেকে ‘বাঁচিয়েছে’ টিকা দেওয়ার হারের ক্ষেত্রে। যদিও আমাদের ওপরে আছে এ অঞ্চলের আর সব দেশ। টিকা দেওয়ার হার নিয়ে কেন আলোচনা করছি, সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে টিকা দেওয়া নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্টের মূল কিছু তথ্য আবার একটু দেখে নেওয়া যাক।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধানদের নিয়ে গঠিত কোভিড-১৯ টাস্কফোর্সের তথ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর টিকা দেওয়ার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

টাস্কফোর্সের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ৬১ শতাংশকে দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ভুটান, প্রায় ৬২ শতাংশ। এরপর রয়েছে শ্রীলংকা, ৯ দশমিক ৩১; ভারত ৭ দশমিক ২৪, নেপাল ৫ দশমিক ৩২ ও পাকিস্তান ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সবার পেছনে থাকা আফগানিস্তানে মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ দুই ডোজ টিকা পেয়েছে।

জনসংখ্যার অনুপাতে এক ডোজ টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। সার্কভুক্ত দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি এক ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে ভুটানে, ৬৩ শতাংশ। এরপর রয়েছে শ্রীলংকা (৪০ দশমিক ৭২), ভারত (২৫ দশমিক ৮১), নেপাল (১২ দশমিক ৫৩), পাকিস্তান (৪ দশমিক ২১), বাংলাদেশ (৪ দশমিক ১৮) ও আফগানিস্তান (১ দশমিক ৯৬)। টাস্কফোর্সের ওয়েবসাইটে প্রতি ১০০ জনের বিপরীতে বিগত সাত দিনে কতজনকে টিকা দেওয়া হয়েছে, তার একটি গড় হিসাবও তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, সবচেয়ে দ্রুত টিকা দেওয়া হচ্ছে শ্রীলংকায়। এরপর রয়েছে নেপাল, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও ভুটান। অবশ্য ভুটানে জনসংখ্যার বড় অংশকে টিকা দেওয়া হয়ে গেছে।

বলা হচ্ছিল, ৭ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহে এক কোটি টিকা দেওয়া হবে। সরকারের এ পদক্ষেপকে সবাই জোরেশোরে সাধুবাদ দিচ্ছিল। কেউ কেউ অবশ্য কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন, এত কম সময়ে এ সংখ্যক টিকা দেওয়ার সক্ষমতা সরকারের আছে কিনা। এর মধ্যেই বিভিন্ন টিকাদান কেন্দ্রে মানুষের যে পরিমাণ ভিড় তৈরি হয়েছে এবং যেমন অব্যবস্থাপনার সাক্ষী হয়েছি আমরা, সেই পরিস্থিতি এ টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও খারাপ হবে কিনা সেসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। কেউ কেউ আবার সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছেন কীভাবে কমিউনিটিকে সংযুক্ত করে এ টিকা দেওয়াকে সফল করে তোলা যায়।

এ চরম ডামাডোলের মধ্যে ৪ আগস্ট রাতে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, এখন আর এক সপ্তাহে এক কোটি টিকা দেওয়ার কর্মসূচি থাকছে না, কারণ হাতে পর্যাপ্তসংখ্যক টিকাই নেই। সরকারের কাছে বর্তমানে টিকার মজুত আছে ৮৯ লাখ ডোজ। তাই এ কর্মসূচি হবে মাত্র একদিন, ৭ আগস্ট- সেদিন প্রথম ডোজ হিসাবে প্রায় অর্ধকোটি টিকা (৪৬ লাখ) দেওয়া হবে। ৪ তারিখেই যদি হাতে ৮৯ লাখ টিকা থাকে, তাহলে স্বাভাবিক টিকাকরণ কর্মসূচির পর ৭ তারিখে কত টিকা থাকার কথা? তাহলে এক কোটি টিকা দেওয়ার পরিকল্পনাটি করা হলো কিসের ভিত্তিতে?

দুর্নীতিকে সরিয়ে রেখেও এ কথা খুব স্পষ্টভাবে বলাই যায়- শুরু থেকেই করোনা মোকাবিলায় কোনোরকম সমন্বিত পরিকল্পনার ছাপ আমরা দেখিনি। যেসব কাজ করতে অর্থ নয়, শুধু ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের প্রয়োজন, সেসব কাজও আমরা আদৌ ঠিকঠাক করে করতে পারিনি। কিছুদিন আগে গার্মেন্টকর্মীদের ঢাকায় আসা নিয়ে যে বীভৎস মানবেতর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তার স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বলে। ওটা ঠিকঠাকমতো ম্যানেজ করার জন্য কতগুলো সময়োচিত সিদ্ধান্তই শুধু দরকার ছিল, টাকা নয়।

এ কয়েকদিন আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল, ১১ আগস্টের পর থেকে ১৮ বছরের বেশি বয়সিদের বাসার বাইরে বের হতে হলে টিকার সনদপত্র দেখাতে হবে, না হলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। এ ঘটনার রেশ মিলতে না মিলতেই ঘটল হাতে টিকা না থাকা সত্ত্বেও কোটি টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করার এ উদ্ভট ঘটনাটি।

৭ আগস্ট সফলভাবে অর্ধকোটি টিকা সফলভাবে দিয়ে দেওয়া গেলে হাতে আর খুব অল্প টিকাই থাকবে। আমরা শুনছি দফায় দফায় অনেক টিকা আসতে থাকবে বাংলাদেশে। সমস্যা হচ্ছে দফায় দফায় টিকা আসার কথা আমরা গত বছর থেকে ধারাবাহিকভাবে শুনে আসছি। খুব কম ক্ষেত্রেই সেই পরিকল্পনা বা প্রতিশ্রুতি বাস্তবতার মুখ দেখেছে। বর্তমানে বিশ্বে টিকার যে পরিস্থিতি তাতে বলা যায়, টিকা সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকার সম্ভাবনা খুব কম। তাহলে হাতের টিকা শেষ হয়ে যাওয়ার পর করোনার টিকা দেওয়ার পরিস্থিতি কী হবে?

বাংলাদেশে এখন করোনা টিকার জন্য রেজিস্ট্রেশনের বয়স নামিয়ে আনা হয়েছে ২৫-এ। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার আশপাশে দেখতে পাই, ৩০ বছরের আশপাশে অনেক মানুষ টিকার রেজিস্ট্রেশন করেছে এবং টিকা পাচ্ছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ৭ আগস্ট যে গণটিকাদান হতে যাচ্ছে তাতে লাখ লাখ তরুণ টিকা পাবে। এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, হাতে থাকা টিকাগুলো দেওয়ার জন্য এরাই কি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ? দেশে করোনায় যারা মারা যাচ্ছেন তাদের বয়সের একটি পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মাঝে মাঝেই আমাদের সামনে আনে।

সেই প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি, করোনায় মারা যাওয়া মানুষের ৭০-৮০ শতাংশের বয়স পঞ্চাশের বেশি। এ তথ্য আমাদের করোনা সম্পর্কে প্রাপ্ত বৈশ্বিক তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। গত বছর করোনা আসার সময় থেকেই আমরা জানি, যেসব মানুষের হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ, অ্যাজমা-ব্রংকাইটিসের মতো কিছু ক্রনিক রোগ থাকে তাদের মৃত্যু ঝুঁকি বেশি। আমাদের দেশের পরিসংখ্যানও ঠিক একই কথা বলছে।

আমাদের হাতে যখন কোটি কোটি টিকা নেই, তখন হাতে থাকা যে টিকাগুলো আছে, এগুলো দেওয়া উচিত করোনায় মৃত্যুঝুঁকি বেশি আছে এমন মানুষদের। অর্থাৎ এ টিকা বয়স্ক মানুষদের দেওয়াটাই সবচেয়ে ন্যায্য। গত বছরের প্রথম দিকে টিকা নেওয়ার ব্যাপারে মানুষের যেমন অনাগ্রহ দেখা দিয়েছিল, এ বছর সেই পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। এ বছর হাতে থাকা টিকাগুলো ৫৫ ঊর্ধ্ব মানুষদের দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা নিলে সেটি খুব সহজেই করা যেত। নিশ্চিতভাবেই মনে করি, উৎসব করে একদিনে এত টিকা দেওয়া দূরেই থাকুক, টিকার রেজিস্ট্রেশনের বয়স ২৫-এ নামিয়ে আনার মতো পর্যাপ্ত টিকাও আমাদের হাতে নেই। এমনকি এখন শোনা যাচ্ছে টিকার রেজিস্ট্রেশনের বয়স ১৮-তে নামিয়ে আনা হবে সহসাই।

সরকার এতটা হুড়াহুড়ি করে এক সপ্তাহে এক কোটি টিকা দিয়ে দিতে চাইছিল কেন, সেই প্রশ্নটা আসতেই পারে। বিশ্বাস করি এর সঙ্গে জড়িত আছে পরিসংখ্যান। এ কলাম যে পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করেছিলাম সেটাই আসলে মূল কারণ।

গত বছর যখন প্রথম সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে করোনা টিকার চুক্তি হয়, যখন টিকার প্রথম চালান দেশে এসে পৌঁছায়, তখন সরকার খুব জোর গলায় বলেছিল, বাংলাদেশ পৃথিবীর শুরুর দিকে টিকা আনতে পারা একটি দেশ। কিন্তু খুব দ্রুতই এ প্রোপাগান্ডার বেলুন চুপসে যায়, যখন ভারতের করোনা পরিস্থিতিতে বিপর্যয় তৈরি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সেরাম টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দিল।

এরপর তো আমরা এখন দেখছি টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের একেবারে তলানিতে পড়ে আছে। স্বাভাবিকভাবেই সরকারের জন্য এটি এক লজ্জার রেকর্ড। বাংলাদেশ যদি এক সপ্তাহে এক কোটি টাকা দিয়ে দিতে পারত, কিংবা বর্তমান হিসাবে একদিনে অর্ধকোটি টিকা দিয়ে ফেলতে পারে, তাহলে টিকা দেওয়ার যে হার, তাতে অনেকটা উন্নতি তাৎক্ষণিকভাবে হয়ে যাবে। সরকার ঠিক এটাই চাইছে।

দেশে সরকারের ব্যর্থতার কারণেই ঠিকমতো লকডাউন/বিধিনিষেধ কার্যকর করা যাচ্ছে না। দেশে সরকার এখন পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যবস্থাকে প্রয়োজন মেটানোর আশপাশেও নিতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে মৃত্যু ঠেকানোর জন্য বয়স্ক মানুষদের টিকা দেওয়া হতে পারত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু সেটাও সরকার না করে পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

ভোক্তার আচরণ ও পণ্যমূল্য
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে
পরিবেশ রক্ষায় জৈবপ্রযুক্তির প্রসার জরুরি
টিকা না নেওয়া কি শাস্তিযোগ্য অপরাধ?
স্বাধীনতার নেপথ্য কারিগর
শিক্ষাঙ্গনে নৈতিকতা ও শিক্ষার মানে অধঃপতন কেন

আরও খবর


close