সোমবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৭.৫৬°সে

যুগে যুগে যুদ্ধ সাংবাদিকতা

মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি

রোমাঞ্চপ্রিয় একঝাঁক সংবাদকর্মী

দৃশ্যপট : উপসাগরীয় যুদ্ধ, ১৯৯১ সাল, ইরাক কর্তৃক অধিকৃত কুয়েতের একটি নতুন উপশহর। বিস্তীর্ণ মরুর বুকে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ঘরবাড়ি ও অন্যান্য অবকাঠামো। একজন যুদ্ধ সাংবাদিকের বর্ণনায় এ উপশহরে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনীর জঙ্গিবিমান থেকে বোমা ফেলার দৃশ্য সরাসরি প্রচার করেছে সিএনএন টেলিভিশন। ক্যামেরা তাক করে আছে, উপশহরে কুন্ডলী পাকানো ধোঁয়া ও বালির দিকে। নেপথ্য থেকে বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছেন সিএনএন-এর যুদ্ধ সাংবাদিক। ইরাকি বাহিনীর কামান কিংবা সামান্যতম ভুলে মিত্রবাহিনীর জঙ্গি বিমানের বোমা এ যুদ্ধ সাংবাদিক কিংবা তার সঙ্গীদের ভবলীলা শেষ করে দিতে যথেষ্ট। কিন্তু ক্যামেরা চলছে, সেই সঙ্গে বর্ণনা। এবার ক্যামেরার সামনে একটি কালভার্ট। দূরে ধোঁয়ার কুন্ডলী। হঠাৎ একটি কার অতি দ্রুত অতিক্রম করল সেই কালভার্ট। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বোমা পড়ে কালভার্টের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়ায় হারিয়ে যায় কালভার্ট। যুদ্ধ সাংবাদিক চিৎকার করে ওঠে, ‘হায় ঈশ্বর, জানি না কারের চালক রিয়ারভিউ মিররে পেছনে দেখার আয়নায় কী দেখেছে। সম্ভবত সে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান ড্রাইভার।’ এর পরপরই সরাসরি সম্প্রচার ছেড়ে স্টুডিওতে ফিরে আসে সিএনএন। প্রিয় পাঠক, এটি কোনো কাল্পনিক দৃশ্য কিংবা নাটক-চলচ্চিত্রের দৃশ্য নয়। সিএনএন টেলিভিশনে সত্যি সত্যি ও সরাসরি সম্প্রচারিত একটি সংবাদ। এমনই ধরনের হাজারও সংবাদ নিয়ে কাজ করেন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার রোমান্সপ্রিয় একঝাঁক সংবাদকর্মী, যাদের পরিচয় যুদ্ধ সাংবাদিক বা ওয়ার করসপনডেন্ট।

 

 

আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ সাংবাদিকতার শুরু

ইউরোপের ইতিহাসের একটি বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে নেপোলিয়নিক ওয়ার বা নেপোলিয়ান যুগের যুদ্ধ। ১৮০৩ সাল থেকে ১৮১৫ সালের মধ্যে এসব যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এসব যুদ্ধ এবং পূর্ববর্তী ফরাসি বিপ্লবজুড়ে রয়েছে ফ্রান্সের শাসক, সেনাপতি ও সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপাটের নাম। নেপোলিয়নের শাসনামলের শেষ সাত বছরে (১৮০৭ থেকে ১৮১৪ সাল) সংঘটিত হয় পেনিসুলার ওয়ার বা উপদ্বীপীয় যুদ্ধ। এ যুদ্ধে একদিকে ছিল ইংল্যান্ডের সমর্থনপুষ্ট স্পেন ও পর্তুগাল আর অন্যদিকে ছিল নেপোলিয়ান তথা ফ্রান্সের দখলদার বাহিনী। এ যুদ্ধে প্রায় ১০ লাখ সৈন্য ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু ঘটে। এ যুদ্ধ বিভিন্ন কারণে প্রসিদ্ধি লাভ করে, যার অন্যতম যুদ্ধ সাংবাদিক সৃষ্টি। ১৮০৮ সালে ইংল্যান্ডের ‘দি টাইমস অব লন্ডন’ পত্রে ডাইরি লিখে পরিচিতি পাওয়া লেখক দাসপ্রথা বিরোধী নেতা এবং পেশায় একজন আইনজীবী (ব্যারিস্টার) হেনরি ক্রাব রবিনসনকে দায়িত্ব দেন পেনিসুলার ওয়ার সংক্রান্ত খবর সংগ্রহ করার জন্য। তিনি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যুদ্ধের বাস্তবচিত্র লিখে পাঠাতেন যা পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ফলে যুদ্ধ শেষে ইতিহাসভিত্তিক বই পড়ে যুদ্ধ সম্পর্কে জানার বিপরীতে সরাসরি সাংবাদপত্র পড়ে যুদ্ধের বাস্তব অবস্থা অনুধাবনের পথ সৃষ্টি করা হয়। এভাবেই আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ সাংবাদিকতার শুরু।

 

Bangladesh Pratidinপ্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও সাংবাদিকতা

১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই থেকে ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর- এ চার বছর পৃথিবী প্রত্যক্ষ করে এক ভয়াবহ যুদ্ধ, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নামে পরিচিত। একদিকে ফ্রান্স, রাশিয়া, ইংল্যান্ড ও আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে গঠিত মিত্রবাহিনী আর অন্যদিকে দুর্ধর্ষ জার্মান অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরিসহ কেন্দ্রীয় বাহিনীর মধ্যে এই যুদ্ধে প্রায় সাত কোটি সৈন্য অংশ নেয়। এর মধ্যে উভয় পক্ষের প্রায় এক কোটি সৈন্য প্রাণ হারায় এবং প্রায় দুই কোটি সৈন্য আহত হয়। যুদ্ধে বৈসামরিক ব্যক্তির মৃত্যু এবং যুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী দাঙ্গা-সংঘাত, অগ্নিসংযোগ ও দুর্ভিক্ষেও কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই যুদ্ধকালে রেডিও টেলিভিশন বা ইন্টারনেটের তেমন প্রচলন না থাকায় জনগণকে সংবাদপত্র কিংবা লোকমুখে শোনা ঘটনার বর্ণনা থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতি অনুধাবন করতে হতো। তবে যত লোকমুখে শোনা কথা প্রায়ই অতিরঞ্জিত হতো। সার্বিক বিচারে বলা যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকেই যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রনেতা ও সেনাপতিরা কাগুজে মিডিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রোপাগান্ডা বা গুজব তৈরির কাজে ব্যবহার করা শুরু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ ও নিজ কর্মকান্ডের সপক্ষে জনমত সৃষ্টি, শত্রুর, মনোবল ভেঙে দেওয়া, নিজস্ব সৈন্যদের চাঙ্গা রাখা এবং সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি অন্যদিকে আকৃষ্ট করা। উদাহরণ হিসেবে বলা হয় আমেরিকা শেষভাগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিলেও তারা যুদ্ধের নিয়ন্ত্রিত সংবাদ প্রচারের জন্য ৮০ জন যুদ্ধ সাংবাদিককে অনুমতি দেয়। যুদ্ধের শুরু থেকে ব্রিটিশ সরকার ‘ওয়েলিংটন হাউস নামে একটি লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান থেকে সুপরিকল্পিতভাবে প্রোপাগান্ডা বা গুজব তৈরি করে এবং এ কাজে তথাকথিত যুদ্ধ সাংবাদিকদের ব্যবহার করে। সঠিক তথ্য ধামাচাপা দিতে ১৯১১ সালে কুখ্যাত অফিশিয়াল ‘সিক্রেট অ্যাক্ট’ চালু হয়েছিল। এ আইনের কঠোর প্রয়োগ দেখা যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধসহ পরবর্তী সময়ে। মিডিয়াকে তথা যুদ্ধ সাংবাদিকতাকে নিয়ন্ত্রণের এ প্রক্রিয়ার পক্ষে-বিপক্ষে পরবর্তীতে বহু তর্ক-বিতর্ক চলে। যুদ্ধকালে মিডিয়া কি নিরপেক্ষ থাকবে না একটি পক্ষ অবলম্বন করবে- এ প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে মিত্রশক্তির কাছে। অন্যদিকে জার্মানরা তাদের মতো সংবাদ তৈরি করে ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে একই সংবাদ প্রকাশের ব্যবস্থা করত। প্রথমদিকে উভয়পক্ষ ছবি তোলার এবং প্রকাশের বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু জার্মানরা তাদের মতো করে ফিল্ম তৈরি করে মিডিয়ায় ছেড়ে দিত। তাই সত্যিকারের যুদ্ধ সাংবাদিকদের মূল্যায়ন হয়নি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও সাংবাদিকতা 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধর ২১ বছর পর অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে বেজে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা, যা চলে ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ যুদ্ধে একদিকে ছিল ব্রিটেন, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন ও অন্যান্য দেশ নিয়ে গঠিত মিত্রবাহিনী। আর অন্যদিকে ছিল জার্মান নেতৃত্বাধীন সেন্ট্রাল ভাস বা অক্ষবাহিনী। জার্মানদের পক্ষ অবলম্বন করে জাপান, ইতালিসহ আরও কিছু দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পরবর্তী সংঘাতে প্রায় আড়াই কোটি সৈন্য মৃত্যুবরণ করে। আহত হয় তারও দ্বিগুণ। যুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী সংকট ও সংঘাতে আহত ও নিহত সাধারণ মানুষের সংখ্যা সৈন্যের সংখ্যারও বেশি ছিল।

নিহতদের তালিকায় অন্তত ১৫ জন ছিলেন যুদ্ধ সাংবাদিক। এ সময়ের অন্তত ৫৫ জন সাংবাদিকের নাম পাওয়া যায়, যারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রেরণ করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এই যুদ্ধ সাংবাদিকদের হাত ধরেই মূলত যুদ্ধ সাংবাদিকতা এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাংবাদিকতার ধরন সম্পর্কে মিশ্র তথ্য পাওয়া যায়। একদিকে বলা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অনেক বেশি যুদ্ধ সাংবাদিককে যুদ্ধক্ষেত্রের সামনে বা ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় এবং সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত সৈন্যদের সঙ্গে কথা বলার ও তাদের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে দেখা যায়, প্রায় সব ক্ষেত্রেই যুদ্ধ সাংবাদিকদের নির্দিষ্ট সেনা জিপে একজন অফিসারের নেতৃত্বে রণাঙ্গনে নেওয়া হতো এবং দিনভর সংবাদ সংগ্রহের পর তাদের টাইপ করার সুযোগ দেওয়া হতো। টাইপকৃত সংবাদ নির্দিষ্ট অফিসার কর্তৃক পরীক্ষার পর তা প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হতো। পরে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রায় একইরকম সংবাদ প্রচারিত হতো। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা হতো কোনো সংবাদ যেন শত্রুদের কোনো অবস্থায় সাহায্য না করে বা স্বস্তি না দেয়। তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক যুদ্ধ সাংবাদিককে একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হতো যে, তারা পরীক্ষা বা সেন্সর ছাড়া কোনো সংবাদ প্রচার করবে না। এমনকি এ অঙ্গীকারের ব্যত্যয় ঘটলে সামরিক আদালতে বিচারের বিধানও রাখা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কার্টুন এঁকে জনপ্রিয়তা পান বিল মাউলডিন। অন্যদিকে সাপ্তাহিক কলাম লিখে তুমুল জনপ্রিয়তা ও পুলিৎজার পুরস্কার পান মার্কিন কলামিস্ট এরনি পাইল। প্রায় সমগ্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কাভার করলেও যুদ্ধ শেষের আগে আগে জাপানের আওতাধীন ওকিনাওয়া এলাকার লি সীমা দ্বীপে জাপানিদের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন এ গুণী যুদ্ধ সাংবাদিক।

 

হিটলার ও গোয়েবলসের ফাঁদে যুদ্ধ সাংবাদিকতা

ইংরেজ কবি, লেখক ও নাট্যকার জন লিলির একটি জগৎখ্যাত উক্তি ছিল ‘প্রেম ও যুদ্ধে সবই শুদ্ধ’। বস্তুত যুদ্ধক্ষেত্রের সব সত্য ঘটনা কোনো সরকার বা সেনাপতি হুবহু জানতে দেন না। শুধু তাই নয়, সত্যের বিপরীতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে শত্রুকে বিভ্রান্ত করা কিংবা নিজস্ব সৈন্যদের চাঙ্গা রাখা একটি অতি সাধারণ কৌশল। তবে মিথ্যার মাত্রা যে কী হতে পারে তা শিখিয়ে গেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের নেতৃত্ব দেওয়া চ্যান্সেলর নাজি দলের প্রধান এবং রণাঙ্গনের সেনাপতি অ্যাডলফ হিটলার। তারই অতি কাছের মানুষ ছিলেন নাজি পার্টির আরেক নেতা এবং বিশ্বযুদ্ধকালীন জার্মানদের তথ্য ও প্রোপাগান্ডা প্রচারের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী পল জোশেফ গোয়েবলস। তিনি নিজে একজন সুবক্তা ছিলেন এবং কথার মাধুর্য দিয়ে সবাইকে বিমোহিত করে জার্মানদের মিথ্যা জয়গান গাইতেন। জার্মানরা যখন বিভিন্ন দেশে চরমভাবে পরাজিত হচ্ছিল, তখনো গোয়েবেলসের প্রচারযন্ত্র ক্রমাগত জয়ের বার্তা প্রচার করত। বিভিন্ন সংবাদপত্র, জার্নাল, রেডিও ও ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানিয়ে জার্মানি ও জার্মান অধিকৃত বিভিন্ন দেশের প্রচার করত গোয়েবেলস। শুধু ডকুমেন্টারি ফিল্মে কৃত্রিম সংবাদ প্রচারের জন্য ব্যবহৃত হয় এক হাজার ৫০০ ভ্রাম্যমাণ ফিল্মভ্যান। সব ধরনের সম্প্রচার ব্যবস্থার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনোদনের সব মাধ্যমেই তিনি হিটলার ও তার দলের জয়গান কোনো না কোনোভাবে সংযুক্ত করে দিতেন।

 

ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও সাংবাদিকতা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় ১০ বছর পর অর্থাৎ ১৯৫৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভিয়েতনাম, লাউস ও কম্পোডিয়ায় বিশ্বের দুই পরাশক্তির মাঝে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়, যা সংক্ষেপে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ভিয়েতনামে তখন বিভক্তি সৃষ্টি করে উত্তর ভিয়েতনামের পক্ষে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চায়না সার্বিক সমর্থন ও যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহ করে। তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং যুদ্ধ সহায়তা দেয় পুঁজিবাদের ধারক ও বাহক আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড ও কমিউনিজমবিরোধী অন্য মিত্ররা। তবে এক পর্যায়ে ভিয়েতনাম আমেরিকান সামরিক উপদেষ্টা ও সৈন্যের উপস্থিতি প্রায় ছয় লাখে পৌঁছলে যুদ্ধটি ভিয়েতনাম বনাম আমেরিকার যুদ্ধ বলে পরিচিতি পায়। মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনী ৫৮ হাজার ৩১৮ সৈন্যের মৃত্যু এবং তিন লক্ষাধিক সৈন্য আহত হওয়ার পর একপর্যায়ে নিজ দেশে ফিরে যায়। একই সঙ্গে ফিরে যেতে বাধ্য হয় তাদের মিত্ররা। যদিও সম্মানের স্বার্থে বলা হয় যে, এটি ছিল সমঝোতার ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবর্তন।

তবে নিঃসন্দেহে এর মধ্য দিয়ে পরাজয়বরণ করে আমেরিকা। তবে পশ্চিমা মিডিয়া জগতের দাবি এই যুদ্ধে আমেরিকা প্রথমে হেরেছিল ওয়াশিংটনে, তারপর ভিয়েতনামে। কারণ বিভিন্নভাবে মিডিয়া আমেরিকার সেন্সরশিপের জাল থেকে বেরিয়ে যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছিল। যুদ্ধ সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক কাছে থেকে উভয় বাহিনীর যুদ্ধ, সৈন্যদের দক্ষতা ও মনোবল, বেসামরিক ব্যক্তিদের ক্ষয়ক্ষতি এবং খোদ আমেরিকান সৈন্যদের আহত ও নিহত হওয়ার খবর প্রচার করতে থাকে। এছাড়াও কলাম লেখকরা ভিয়েতনামের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকার সৈন্যবাহিনীর খবরদারি এবং যুদ্ধের পক্ষে মার্কিন প্রশাসনের খোঁড়া যুক্তির অসারতা তুলে ধরে। ১৯৬৩ সালের ২ জানুয়ারি হেলিকপ্টার, কামান ও সৈন্যবাহী বিশেষ সামরিক যান (এপিসি) সজ্জিত আমেরিকান প্রশিক্ষিত সৈন্যরা এবং তাদের কাছে প্রশিক্ষণ ও উপদেশপুষ্ট দক্ষিণ ভিয়েতনামে নিজস্ব বাহিনী উত্তর ভিয়েতনামী তথা কমিউনিস্টদের ওপর আক্রমণ চালায়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধকে অপরদিকে ‘প্রথম টেলিভিশন যুদ্ধ’ও বলা হয়। এ যুদ্ধের সময় ধারণকৃত দৃশ্যের রিল বা ফিল্ম জাপানের টোকিওতে বিশেষ বিমানে পাঠান হতো। সেখানে ডেভেলপ ও এডিটিং শেষে আবারও বিমানে পাঠানো হতো ওয়াশিংটনের টেলিভিশন কেন্দ্রসমূহে। অনেক সময় টোকিও থেকেও এসব দৃশ্য সরাসরি পৌঁছে যেত দর্শকদের ঘরে ঘরে। ভিয়েতনামের একদিকে সমুদ্র ও অন্যদিকে থাইল্যান্ড ও চীন থাকায় বস্তুত যুদ্ধ সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহ শেষে পাশের দেশে প্রবেশ করত এবং সেখান থেকেই পাঠিয়ে দিত নিজস্ব মিডিয়া হাউসে। তাই বাস্তবিক অর্থে মিডিয়াকে তথা যুদ্ধ সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকানদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। মিডিয়ার কারণে মার্কিনিদের আরোপিত যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং মার্কিনিদের সীমাবদ্ধতার পক্ষে জনমত তৈরির এ ধারা পরবর্তীতে ‘ভিয়েতনাম সিনড্রম’ নামে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।

 

প্রযুক্তির চমক ও যুদ্ধ সাংবাদিকতা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের এক অপূর্ব মেলবন্ধন রচিত হয় উপসাগরীয় যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ১৯৯০ সালের ২ আগস্ট ইরাকের জাঁদরেল শাসক সাদ্দাম হোসেনের একগুঁয়ে সিদ্ধান্তের কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ কুয়েত দখল করে ইরাকি বাহিনী, যা শেষ হয় ১৯৯১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। ইরাক এ যুদ্ধে প্রায় তিন লাখ সৈন্য মোতায়েন করে কুয়েতে এবং কুয়েত-সৌদি আরব সীমান্তে। অন্যদিকে জাতিসংঘের সম্মতিক্রমে ৩৯টি দেশের প্রায় সাত লাখ সৈন্য নিয়ে সম্মিলিত বাহিনী তৈরি হয় মার্কিন নেতৃত্বে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে মার্কিন প্রশাসন ও মার্কিন সেনা কর্তৃপক্ষ মিডিয়াকে তথা যুদ্ধ সাংবাদিকতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এ যুদ্ধে সমগ্র পৃথিবী টেলিভিশনে সরাসরি চলমান সংঘাত, বেইজ বা জঙ্গি বিমানবাহী রণতরী থেকে বিমানের ওঠা ও মিশন শেষে নেমে আসা (ল্যান্ডিং) সুনির্দিষ্ট টার্গেট ধ্বংস প্রভৃতি প্রত্যক্ষ করে। এমনকি আকাশ থেকে মাটিতে নিক্ষিপ্ত মিসাইল ও বোমায় সংযুক্ত ক্যামেরা সুনির্দিষ্ট স্থানে (যেমন ব্রিজ, রেডিও বা টিভি সেন্টার, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইত্যাদি) বোমাটি পড়ছে কিনা তাও সম্প্রচার করে। ফলে ভিয়েতনাম যুদ্ধ বা পূর্ববর্তী অন্যান্য যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে গুজব সৃষ্টির মতো পরিস্থিতির জন্ম হয়নি। উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকি বাহিনীর ছোড়া স্কাট মিসাইলকে আকাশেই ধ্বংস করে মিত্রবাহিনীর ‘পেট্রিয়ট’ নামের মিসাইল। আর সেই দৃশ্য সরাসরি প্রত্যক্ষ করে সারা বিশ্ব। এসব দৃশ্য কিংবা যুদ্ধের ময়দানে ছুটে চলা ট্যাংকের ওপর বসে সরাসরি ধারা বর্ণনার দৃশ্য দেখিয়ে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায় মার্কিন টেলিভিশন সিএনএন। পিছিয়ে থাকেনি এবিসি, এনবিসি কিংবা সিবিএস-এর মতো টেলিভিশন। বিশেষত ১৬ জানুয়ারি ১৯৯১ সালে এসব টেলিভিশনে যখন ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে শহরে ভুতুড়ে নীরবতার কথা সরাসরি প্রচার করছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ বোমার তীব্র আলো এবং আকাশবিদারী শব্দে বাগদাদ কেঁপে ওঠার কথা প্রচার করে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। যুদ্ধ সাংবাদিকরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের টেলিভিশন বিশেষত লন্ডনভিত্তিক বিবিসি টেলিভিশন ও রেডিও তখন নতুন আঙ্গিকে যুদ্ধের সব খবর পরিবেশন করে জনপ্রিয়তা পায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ কর্তৃক অপারেশন ‘ডেজার্ট শিল্ড’ থেকে ‘ডেজার্ট স্টর্ম’-এ রূপান্তর তথা যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা ও ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন কর্তৃক এ যুদ্ধকে ‘মাদার অব অল ব্যাটেল’ ঘোষণা যুদ্ধ সাংবাদিকতাকে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে দেয়।

 

একাত্তরে যুদ্ধ সাংবাদিকতা

বাকস্বাধীনতা, তথ্য সংগ্রহ, তথ্য প্রকাশ ও তথ্য জানার অধিকার এমনকি শুধু বেঁচে থাকার অধিকারকে নির্মমভাবে পিষ্ট করার বিরুদ্ধে সংগ্রামের আরেক নাম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ নিরীহ বাঙালি প্রাণ হারান। আহত হন আরও অনেকে। এই আহত ও নিহতদের তালিকায় আছেন দেশ-বিদেশের যুদ্ধ সাংবাদিকরাও। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতাকামী সংবাদকর্মীদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়। আবার সরাসরি যুদ্ধ করেও শহীদ হয়েছেন অনেকে। এর মধ্যে ৩১ মার্চ রাতে দৈনিক সংবাদ অফিসে পাকিস্তানিদের আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগে মৃত্যুবরণ করেন দৈনিক সংবাদের সাংবাদিক শহীদ সাবের। আর ডিসেম্বর মাসে স্বাধীনতা লাভের পূর্বক্ষণে গুম ও হত্যা করা হয় প্রথিত সাংবাদিক ও লেখক শহীদুল্লাহ কায়সার (সংবাদ), সিরাজুল ইসলাম (ইত্তেফাক), সেলিনা পারভীন (সাপ্তাহিক বেগম, ললনা ও শিলালিপি)-সহ আরও অনেক সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী। রণাঙ্গনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রাণ হারান বা হারিয়ে যান দেশ-বিদেশের অনেক যুদ্ধ সাংবাদিক। তাদের মধ্যে অন্যতম সুরজিত ঘোষাল (আনন্দ বাজার) এবং দীপক ব্যানার্জি (অমৃত বাজার)।

একাত্তরে যুদ্ধ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন ইংল্যান্ডের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দি ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এর তৎকালীন সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। উত্তাল মার্চে তিনি ঢাকায় আসেন সংবাদ সংগ্রহের জন্য। ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকায় কর্মরত সব বিদেশি সাংবাদিককে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবরুদ্ধ করা হয়। সায়মন ড্রিং বিষয়টি অনুমান করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রান্নাঘর ও ছাদে লুকিয়ে থাকেন এবং সেই কালরাতের বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেন। সংবাদের ফ্রন্ট নোট লিখতে থাকেন। দুইদিন পর হোটেল থেকে সব বিদেশি সাংবাদিককে প্রথমে ঢাকা বিমানবন্দর এবং পরে পশ্চিম পাকিস্তানে প্রেরণ করা হয়। এ সময় সায়মন ড্রিং গোপনে ঢাকা শহর বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ কলেজ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের মতো মৃত্যুপুরিগুলো প্রত্যক্ষ করেন। পরে তিনি পালিয়ে ব্যাংকক যান এবং ৩০ মার্চ ৭১-এ ‘দি ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় তার লেখা ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান : সেভেন থাউজেন্ড স্লটার্ড, হোমস বার্নড’ শীর্ষক প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিশ্ববাসী সর্বপ্রথম একাত্তরের গণহত্যা সম্পর্কে অবগত হন ও শিউরে ওঠেন। পরবর্তীতে তিনি আবারও মুক্তিযুদ্ধ কভার করেন এবং ১৬ ডিসেম্বরে মিত্র বাহিনীর সঙ্গে স্বাধীন দেশে প্রবেশ করেন। সায়মন ড্রিংয়ের সঙ্গে ২৫ মার্চ রাতে পালিয়ে থাকা আরেক বিদেশি হলেন ফরাসি নাগরিক ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ফটোসাংবাদিক মাইকেল লরেন্ট। পাকিস্তানি জান্তার চাপে দেশ ত্যাগ করলেও স্বাধীনতা লাভের ১ দিন পর (১৮ ডিসেম্বর) আবার দেশে ঢোকেন এবং যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ও শরণার্থীদের মানবেতর জীবনের চিত্র ধারণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ কভার করার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত এই ফটোসাংবাদিক। পাকিস্তানি এমন বর্বরতার বিরুদ্ধে কলাম লিখে অমর হয়ে আছেন পাকিস্তানেরই সাংবাদিক এন্থনি মাসকারেনহাস। একাত্তরের ১৩ জুন এই সাংবাদিকের লেখা গণহত্যা বা জেনোসাইড শীর্ষ দুই পৃষ্ঠার (১৬ কলাম) নিবন্ধ প্রকাশ করে লন্ডনের ‘দি সানডে টাইমস’। এতে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে দ্রুতই বিশ্ব জনমত গড়ে ওঠে। মার্কিন নাগরিক ও ইহুদি যুদ্ধ সাংবাদিক সিডনি স্ক্যান বার্জ মুক্তিযুদ্ধের ওপর দি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সব সংবাদের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (বিবিসি) রেডিও। সংক্ষিপ্ত সংবাদের পর ‘প্রবাহ’ নামক বিশ্লেষণে বিবিসির ভারতীয় অঞ্চলের প্রধান মার্ক টালির সম্পাদনায় উঠে আসত মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র, যা পরবর্তীতে অন্যান্য ভাষায়ও বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ত। আর বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাড়ি জমানো একদল সাংবাদিক ও শিল্পী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে ক্রমাগত উদ্বুদ্ধ করার মতো সংবাদ, গান, কথিকা, রম্য রচনা প্রভৃতি প্রচার করত। ‘জয় বাংলা’ নামক পত্রিকায়ও যুদ্ধ সাংবাদিকরা বাস্তবচিত্র তুলে ধরতেন। ঢাকার বুকে বসেই নটর ডেম কলেজ থেকে নেওয়া সাইক্লোস্টাইল মেশিনে  ‘গ্রেনেড’ নামে হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করে তাক লাগিয়েছিল একদল তরুণ গেরিলা, যারা ‘বিচ্ছু’ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

তথ্য সূত্র-দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

সুনামগঞ্জের আলোক বাতি ।। সাংবাদিকতার এক দিকপাল হাসান শাহরিয়া
সাংবাদিকতার সোনালী ভবিষ্যৎ, প্যাশন এবং প্রফেশনের যুগলবন্দী
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ রুখতে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে
তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বাংলাদেশ সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মার্চ থেকে চলছে মুক্তিযুদ্ধ
গণজোয়ারের সেই দিন

আরও খবর