রবিবার, ১৭ই অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ১৬°সে
সর্বশেষ:
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে নিলামে বিক্রি হবে ১১০টি বিলাসবহুল গাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৭ হাজীগঞ্জে ধর্ষণের ঘটনা গুজব : হিন্দু নেতারা কুমিল্লার ঘটনার পেছনের কারণ খোঁজা হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে সৌদি জোটের হামলায় নিহত ১৬০ প্রতীক্ষার রবিউল আউয়াল ৪ জন নিহতের ঘটনায় মাগুরায় গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে মানুষ সানি-আমিশা জুটি মুক্তি পাবে ‘গাদার ২’ শিরশ্ছেদ-অঙ্গছেদের শাস্তির ব্যাপারে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে তালেবান সারাদেশে মাদক পাঠাতেন খোকন ও রফিক যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে মোটর সিটি শিরোপা জিতেছে এশিয়া ইউনাইটেড যেসব চ্যানেলে দেখা যাবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ 

ইরান-আজারবাইজান সীমান্তে উত্তেজনা

 

ভিওএনজে ডেস্ক:
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান এবং আজারবাইজানের সীমান্তে উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দু’দেশ যে কোন সময়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আজারবাইজান,তুরস্ক ও পাকিস্তান মিলে ‘তিনভাই’ নামক সামরিক অনুশীলন করেছে কিছু দিন আগে। যা ইরান ভালোভাবে নেয়নি। অন্যদিকে ইরানও সামরিক প্রশিক্ষণের নামে আজারবাইজান সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা ও অস্ত্র মোতায়েন করছে। প্রতিদিনই সেখানে বাড়ছে সেনা উপস্থিতি। সীমান্তের এই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে দু দেশের মূল ধারার গণমাধ্যমে। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুই দেশের নেটিজেনরা তো অলরেডি যুদ্ধ শুরু করেই দিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়া অঞ্চলে ইরান এবং ইরাকের পরে শিয়া মতবাদের লোকদের সবচেয়ে বেশি বসবাস এই আজারবাইজানে। দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ৮০ ভাগ লোক শিয়া মতাদর্শে বিশ্বাসী। কিন্তু এই অঞ্চলে অন্য যে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আছে যেমন ইরান, ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন, বাহরাইন এবং সিরিয়া, এগুলোর থেকে আজারবাইজানের রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটি সাংবিধানিকভাবে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র। এবং এতো বড় শিয়া জনগোষ্ঠীর দেশ হওয়া সত্ত্বেও শিয়া মতাদর্শ প্রচারে মরিয়া ইরানের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুবই খারাপ।

এতোই খারাপ যে একে অপরের শত্রুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে। যেমন ইরানের চির শত্রু ইসরাইল। কিন্তু আজারবাইজানের আছে এই ইসরাইলের সঙ্গে খুবই শক্তিশালী সামরিক সম্পর্ক। অন্যদিকে আজারবাইজানের চির শত্রু আরমেনিয়া, অথচ ইরানের আছে এই আরমেনিয়ার ইরানের সঙ্গে শক্তিশালী সামরিক, বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক।

গত বছর নাগরনো-কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের মধ্যে যে যুদ্ধ সংগঠিত হয় সেই যুদ্ধে আজারবাইজান পায় তুরস্ক এবং ইসরাইলের সাপোর্ট। অন্যদিকে ইরান আজারবাইজানের বিরুদ্ধে গিয়ে আরমেনিয়ায় হেলিকপ্টার এবং ট্রাক ভর্তি সমরাস্ত্র ও সামরিক সাহায্য পাঠায়। এমনকি সেই যুদ্ধে আর্মেনিয়ার বিজয়ে খুশি হতে পারেনি ইরান। তারপরে, ইরান আজারবাইজানকে তাদের সীমান্তে ইসরাইলের মত আরেকটি জায়নবাদি রাষ্ট্র বলে অভিহিত করতেও দ্বিধাবোধ করেনি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এতো শত্রুতার কারণ কী?

এখানে আমরা প্রধান চারটা কারণের কথা উল্লেখ্য করতে পারি।

১. ইরানে বসবাসকারী প্রায় ৪ কোটি আজেরি জনগোষ্ঠী আছে যারা সবসময়ই ইরানের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার বিরুদ্ধে পোটেনশিয়াল হুমকি সরূপ। যদিও এই আজেরিদের অনেকেই ইরানের বড় বড় পদে আছেন। কিন্তু অনেক আজেরি আছেন যারা ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাদের অনেকে জেল জুলুম হত্যা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। এই আজেরিদের উপড়ে আজারবাইজান এবং তুরস্কের ভালো একটা প্রভাব আছে।

২. নাগরনো কারাবাখ সমস্যা। যা ইরান সবসময় জিয়িয়ে রেখে নিজের স্বার্থ হাসিল করছে।

৩. ক্যাস্পিয়ান হ্রদের খনিজ সম্পদ বণ্টনে আজারবাইজান ইরান এবং রাশিয়ার মধ্যে বিরোধ।

৪. আজারবাইজানের সঙ্গে তুরস্ক এবং ইসরাইলের অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে আরমেনিয়া সম্পর্ক।

৫. কারাবাখ যুদ্ধের পরে আজারবাইজান এবং তুরস্কের মধ্যে শুশা চুক্তি স্বাক্ষর। যে চুক্তি ককেশাস এবং মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের জন্য নতুন দিগন্তের উম্মচন করেছে। এই চুক্তির মধ্যমে আগামী কয়েক বছরে মধ্য এশিয়ার ভুরাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এবং তুরস্কের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাবে।

এবার এগুলোকে একটু খোলাসা করি। আজকের আজারবাইজান, জর্জিয়া এবং আরমেনিয়া একসময় ছিল ইরানের অংশ। কিন্তু ১৮০৪ থেকে ১৮২৮ সাল পর্যন্ত তখনকার ইরান এবং রাশিয়ার মধ্যে দুইবার যুদ্ধ হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের সেই যুদ্ধে ইরান পরাজিত হয়। তখন রুশ সাম্রাজ্য এবং ইরানের কাজার রাজবংশের সঙ্গে গুলিস্তান এবং তুর্কমেনচাই নামে দুটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ওই চুক্তির মাধ্যেমে ইরান এবং রাশিয়ার সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করা হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী আরাস নদীকে তারা সীমানা হিসেবে মেনে নেয়।সে অনুযায়ী আজকের জর্জিয়া, আজারবাইজান এবং আরমেনিয়ার একটা অংশ রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ইরান। তখন আজেরি জনগোষ্ঠীরা ওই আরাস নদীর দুই সাইডে ভাগ হয়ে যায়।

উত্তর আজারবাইজান রাশিয়ার অংশ হয় এবং দক্ষিণ আজারবাইজান ইরানের অংশ হিসেবে থেকে যায়। তারপর অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়েছে ওই অঞ্চল। স্নায়ু যুদ্ধের পরে ১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে মধ্য এশিয়াতে অনেকগুলো দেশের জন্ম হয় তখন এই উত্তর আজারবাইজান নামক অংশটিই আজকের আজারবাইজান হিসেবে স্বাধীন দেশের মর্যাদা লাভ করে।

স্বাধীনতার পরপরই ইরান আজারবাইজানকে স্বীকৃতি দেয়। এবং আজারবাইজানের সঙ্গে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলে। তখন আজারবাইজানে ইরানের প্রভাব ছিল দেখার মত।সদ্য স্বাধীনতা লাভ করা এই দেশটিকে ইরান সব ধরণের সাহায্য সহযোগিতা করার প্রস্তুতি নেয়। দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা সফর করেন। সদ্য জন্ম নেয়া এই আজারবাইজানকে ইরান তার প্রভাবের অধীনে আনতে সক্ষম হয়। তবে আজারবাইজানের জন্মের আগে থেকে থেকেই নাগরনো কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে সমস্যা ছিল আরমেনিয়ার সঙ্গে।

জাতিগত আজেরি এবং আর্মেনীয়দের সঙ্গে ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। সে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৯৯২ সালে আজারবাইজান এবং আরমেনিয়ার মধ্যে ইরানের মধ্যস্থতায় একটা শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু এই চুক্তির তিন চার সপ্তাহ পরেই আর্মেনীয় সেনাবাহিনী আজারবাইজানের খোজালি অঞ্চলে আক্রমণ করে গণহত্যা চালায়।

পরবর্তীতে নাগরনো কারাবাখের শুশা এবং লাচিন অঞ্চল দখল করে নেয়। এর পরে সেবছরই আজারবাইজানে ক্ষমতার পালাবদল হয়। দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন আব্দুলফাজ এলচিবেই।

প্যান-তুর্কী চিন্তাধারায় বিশ্বাসী এই এলচিবেই ছিলেন কট্টর ইরান বিরোধী। তিনি ইরানের পরিবর্তে তুরস্ককে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। আজেরিদেরকে তুর্কি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করেন। ইরানের সীমানার মধ্যে থাকা দক্ষিণ আজারবাইজান অঞ্চলকে দখল করে আজারবাইজানের অংশ বানানোরও ঘোষণা দেন। তার এই মনোভাব আজেরি তুর্কিদের মধ্যে ব্যপক সারা ফেলে। ইরানে বসবাসরত ৩-৪ কোটি আজেরিদেরও একটা অংশ এই ধারণা পোষণ করে।

তখন ইরান আজারবাইজানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। নাগরনো কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে যুদ্ধে লিপ্তে থাকা আজারবাইজানের শত্রু আরমেনিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। তখন থেকে ইরান নিজের অখণ্ডতা রক্ষায় সবসময়ই আজারবাইজানকে দুর্বল রাখার চেষ্টা করে। আজারবাইজানের মধ্যের ঝামেলা বাঁধিয়ে রাখার নীতি অবলম্বন করে। শুরু হয় ইরান-আজারবাইজান স্নায়ু যুদ্ধের।

ইরান আস্তে আস্তে আরমেনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করে। অন্যদিকে আজারবাইজান ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করে। ইসরাইল থেকে প্রচুর সামরিক সরঞ্জাম কিনে। সে সময়ে তুরস্কের সঙ্গে আজারবাইজানের সম্পর্ক প্রত্যাশিত পর্যায়ে ছিল না। আজারবাইজান তুরস্ক থেকে আরও বেশি সাপোর্ট আসা করতো সবসময়।কিন্তু পেত না।

এর মধ্যে ২০০৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আজারবাইজান এবং ইরানের মধ্যের দ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, আজারবাইজানের রাজধানীর উপর দিয়ে ইরানের যুদ্ধ বিমান উড়িয়ে আজারবাইজানকে হুমকি দেয় তেহরান। এমনকি কাস্পিয়ান হ্রদে আজারবাইজানের তেল অনুসন্ধানী জাহাজকে তাড়িয়ে একেবারে বাকুর উপকণ্ঠে নিয়ে যায় ইরানের যুদ্ধ জাহাজ। আজারবাইজানের প্রেসিডেন্টকে গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টারও আভিজোগ আছে ইরানের বিরুদ্ধে।

সে সময় তুরস্ক এগিয়ে যায় আজারবাইজানকে সাহায্য করতে। তুরস্কের যুদ্ধ বিমান মহড়া দেয় বাকুর আকাশে। এবং ইরান পিছপা হয়। তখন থেকে আস্তে আস্তে শক্তিশালী হতে থাকে তুরস্ক-আজারবাইজান সম্পর্ক। অন্যদিকে ইরানকে চাপে রাখতে বিভিন্ন সময় ইরানে বসবাসরত আজেরি তুর্কিদের মদদ দেয়ার অভিযোগও আছে আজারবাইজানের বিরুদ্ধে।

ইরান মনে করে আজারবাইজান এবং তুরস্ক যত শক্তিশালী হবে এই অঞ্চলে ইরানের প্রভাব ততই হুমকির মুখে পড়বে। ইরানের মধ্যের আজেরবাইজান অঞ্চলে বিদ্রোহ আরও দানা বেঁধে উঠবে। এ কারণে ইরান নাগরনো কারাবাখের সমস্যা জিইয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল। এছাড়াও এই নাগরনো কারাবাখ অঞ্চল আরমেনিয়ার দখলে থাকায় স্থল পথে তুরস্ক থেকে মধ্য এশিয়ায় পৌঁছতে ইরানের ভূখণ্ড ব্যাবহার করতে হত।

তুরস্ক থেকে ওই অঞ্চলে পণ্য সরবরাহের জন্য ইরানের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। অর্থাৎ তুরস্কের মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে স্থল যোগাযোগে ইরান ছিল অন্যতম একটা দেশ। কিন্তু ইরান বিভিন্ন অজুহাতে অনেক সময়ে এসব তুর্কি পণ্যবাহী ট্রাকের গতিরোধ করে। দিনের পর দিন পথ আটকে রাখে। এ কারণে কাস্পিয়ান হ্রদ থেকে আজেরি তেল-গ্যাস তুরস্ক আনতে পাইপলাইন টানা হয়েছে জর্জিয়ার মধ্য দিয়ে।

এখন এই নাগরনো কারাবাখ স্বাধীন হওয়ার কারণে আজারবাইজান আরও শক্তিশালী হলো। একই সঙ্গে শক্তিশালী হলো আজেরি-তুর্কি সম্পর্ক। সামরিকভাবে আজারবাইজান নিজেকে নতুনভাবে সাজিয়ে তুলছে।

তুরস্ক থেকে আজারবাইজানে পৌঁছতে আর্মেনিয়ার মধ্য দিয়ে একটা করিডোর করারও চুক্তি হয় সেই কারাবাখ যুদ্ধের পরে। এতে করে তুরস্ক ইরানকে বাইপাস করে সরাসরি পৌঁছতে পারবে আজারবাইজানে এবং সেখান থেকে মধ্য এশিয়ায়। এছাড়াও এবছর জুন মাসে তুরস্ক এবং আজারবাইজান ঘোষণা করে শুশা ডিক্লারেশন। সে অনুযায়ী এই দু’দেশের কোন একটায় তৃতীয় কোন দেশ থেকে আক্রমণ আসলে একে অপরকে সরাসরি সামরিক সহযোগিতা দিবে। এবং এই দুই দেশের সেনাবাহিনীকে আধুনিক করতে একে অপরের সঙ্গে কাজ করবে।

এছাড়াও তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আজারবাইজানে একটা সামরিক শিল্প গড়ে তুলবে। এই শুশা চুক্তি ইরান এবং আর্মেনিয়ার জন্য কারাবাখ যুদ্ধের চেয়েও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আসলে তুরস্কের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের মধ্যে তার্কিক রাষ্ট্রগুলো নিয়ে মধ্য এশিয়াতে যে বৃহৎ ঐক্য গঠনের প্রচেষ্টা চলছে, কারাবাখ যুদ্ধের বিজয় এবং এই শুশা চুক্তি সে ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। আর এতে খর্ব হবে ইরান এবং রাশিয়ার প্রভাব।

এই ছিল ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা।

এর পরে আছে ক্যাস্পিয়ান সাগরে খনিজ সম্পদ বণ্টন নিয়ে বিরোধ। কাজাখিস্তান, আজারবাইজান এবং রাশিয়া ওই সাগরে যার যতটুকু সীমানা সে অনুযায়ী ভাগ পাওয়ার পক্ষে। সে অনুযায়ী কাজাখিস্তানের ৩০ ভাগ, রাশিয়ার ২০ ভাগ, আজারবাইজানের ১৯ ভাগ, তুর্কমেনিস্তানের ১৫ ভাগ এবং ইরানের শতকরা ১৪ ভাগ তেল ও গ্যাস পাওয়ার কথা।কিন্তু ইরান চায় ওই সাগরের খনিজ সম্পদ এই পাঁচটি দেশের মধ্যে সমান ভাবে ভাগ হবে। অর্থাৎ সবাই শতকরা ২০ ভাগ করে পাবে। এ কারণে, আজারবাইজান তার জলসীমায় তেল গ্যাস অনুসন্ধান চালালে ইরানের যুদ্ধ জাহাজ তাদেরকে ধাওয়া করার ঘটনাও ঘটেছে অনেকবার।

এছাড়াও আজারবাইজানে শিয়াদের প্রভাব বিস্তারে সরকারের বাঁধা, ইসরাইলের কাছ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনা, সহ তেল গ্যাস বিক্রিতেও আজারবাইজানের সঙ্গে ইরানের দ্বন্দ্ব চলছে।

অর্থাৎ ইরান এবং আজারবাইজানের বর্তমান দ্বন্দ্বের পিছনে আছে পাঁচটি মূল কারণ। অর্থাৎ আর্মেনিয়ার দখল থেকে নাগরনো কারাবাখ অঞ্চলের মুক্তি, কাস্পিয়ান হ্রদের খনিজ সম্পদ বণ্টন, ইরানে বসবাসরত আজেরি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী, তুরস্ক আজারবাইজানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, ইসরাইল আজারবাইজানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, এবং ইরান-আরমেনিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এগুলোকে আঞ্চলিক ভুরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে বোঝা যাবে যে আজারবাইজানের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের বৈরি ভাব খুব সহজে কাটিয়ে ওঠার নয়।

এই বৈরী ভাব আরও খারাপ হয় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে। আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ ইরানের বিরুদ্ধে আরমেনিয়ায় অস্ত্রবাহী ট্রাক পাঠানোর অভিযোগ করেছেন। তার মতে, ইরান আজারবাইজানকে না জানিয়ে রাশিয়ার শান্তিরক্ষী বাহিনীর চোখের সামনে দিয়ে নাগরনো কারাবাখের এখনো যে এলাকাগুলো আর্মেনীয়দের দখলে আছে সেই অঞ্চলে অস্ত্রের ট্রাক পাঠাচ্ছে। আজারবাইজানের এই নাগরনো কারাবাখ সীমান্তে ইরানের সামরিক প্রশিক্ষণের নামে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করছে বলেও দাবি করেন আজেরি প্রেসিডেন্ট। তিনি প্রশ্ন করেন, গত ত্রিশ বছর ধরে ওই অঞ্চল যখন আরমেনিয়ার দখলে ছিল তখন ইরান এই সীমান্তে একবারও সামরিক মহড়া করেনি। অথচ কারাবাখ অঞ্চল মুক্তির মাত্র এক বছরের মাথায়ই ইরান কেন ওখানে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি ঘটিয়ে মহড়া করছে। তার মতে এর পিছনে ইরানের নিশ্চয়ই কোন মতলব থাকতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ইরান কেন এমনটি করছে? ইরান কি আজারবাইজানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায়?

অনেকে মনে করেন, গত কিছুদিন আগে আজারবাইজান, তুরস্ক এবং পাকিস্তান মিলে “তিন ভাই” নামের যে সামরিক মহড়া করেছে ইরান তারই প্রতিশোধ হিসেবে আজারবাইজান সীমান্তে সামরিক মহড়া করে নিজের শক্তি প্রদর্শন করছে একই সঙ্গে হুমকিও দিচ্ছে। আবার অনেকে এও ধারণা করেন যে তুরস্ক আজারবাইজানের সঙ্গে চুক্তি করে ইরানকে বাইপাস করে যাঙ্গেযুর করিডোর দিয়ে মধ্য এশিয়ায় পৌছার যে পরিকল্পনা করছে, সেই পরকল্পনাকে ভণ্ডুল করতেই ইরান ওই অঞ্চলে একটা যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ রাখতে চায়। কারণ কারাবাখ যুদ্ধের পরে আজারবাইজান, আর্মেনিয়া এবং রাশিয়ার মধ্যে যে চুক্তি হয় সে অনুযায়ী আর্মেনিয়া এই যাঙ্গেযুর এলাকা দিয়ে তুরস্ক থেকে আজারবাইজান পর্যন্ত একটা করিডোর করার সুযোগ দিবে।এবং এই করিডোরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকবে রাশিয়ার হাতে। কিন্তু ওই অঞ্চলে আর্মেনীয় উগ্রবাদীদের আক্রমনের দোহাই দিয়ে রাশিয়া এখনো পর্যন্ত সে করিডোর বা ট্রানজিটের কাজ শুরু করার অনুমতি দেয়নি। এখন ইরান ওই অঞ্চল উত্তপ্ত করলে সে করিডোর করার কাজ আরও পিছিয়ে যাবে। ব্যর্থ হবে তুরস্কের বিশাল মধ্য এশিয়া প্লান।

এ কারণেই কারাবাখ অঞ্চলে আর্মেনীয়দের কাছে অস্ত্র পাঠিয়ে হয়ত ওই অঞ্চলে আবার নতুন করে কোন্দল সৃষ্টি করতে চাইছে ইরান। সেই কোন্দল যত সত্যিই বড় সংঘাতে রূপ নেয় তাহলে তুরস্কের সীমান্তবর্তী আজারবাইজানের ভূমি নাখচিভান থেকে আরমেনিয়ার মধ্য হয়ে কারাবাখ পর্যন্ত এই যেনগেযুর ট্রানজিট প্লানও ভেস্তে যাবে। এতে আজারবাইজান তার এই দুই ভূখণ্ডের মধ্যে কোন স্থল যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারবে না। একিভাবে তুরস্কের সরাসরি মধ্য এশিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা ভণ্ডুল হবে। তখন এই দুই দেশে ওই রুটে আবার ইরানের উপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে রাশিয়াও চাইছে না যে এই তুরস্ক এই করিডোরটি পাক। কারণ এই করিডোর বা ট্রানজিট হওয়ার অর্থ হচ্ছে ওই অঞ্চলে অর্থাৎ মধ্য এশিয়ায় এবং ককেশিয় অঞ্চলে তুরস্কের সরাসরি প্রভাব বিস্তার করা। যা রাশিয়া এবং ইরান কোন ভাবেই মেনে নিতে পারবে না। এ কারণেই, কারাবাখ যুদ্ধ শেষ হওয়ার এক বছর পরেও এই যেনগেযুর করিডোর তৈরির কাজ এখনো শুরু করতে পারেনি আজারবাইজান।

অন্যদিকে আজারবাইজান এবং তুরস্ক হয়তো ইরানে বসবাসকারী আজেরিদের উস্কিয়ে দিয়ে ইরানকে ভিতর থেকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করবে।

এছাড়াও, তুরস্ক-ইরান সম্পর্কে আরও অনেক সমস্যা আছে। যেগুলো এই আজারবাইজান ইরান সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে। সেগুলো নিয়ে হয়ত আরেকদিন আলোচনা করবো।

তথ্য সূত্র-যুগান্তর

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে সৌদি জোটের হামলায় নিহত ১৬০
শিরশ্ছেদ-অঙ্গছেদের শাস্তির ব্যাপারে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে তালেবান
সেই ছুরিকাঘাতেই ক্ষমতাসীন ব্রিটিশ এমপি’র মৃত্যু
ছুরিকাঘাতে ব্রিটিশ এমপি নিহত
বিদ্রোহীদের চোরাগোপ্তা হামলায় মিয়ানমারের অর্ধশত সেনা নিহত
চীনে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় কোরআন অ্যাপ সরিয়ে নিয়েছে অ্যাপল

আরও খবর


close